বর্তমান সরকারের সাত মাসের শাসনামলে রাজনৈতিক অপরিপক্বতা ও অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজার রহমান ইরান। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে অনেক ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়ে তদবির, লেজুড়বৃত্তি ও পদ-পদবির ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত থেকেছে। শ্রমিক পরিবারগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করতে হিমশিম খাচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং দক্ষতার অভাব প্রকট। এই স্বল্প সময়ে চারজন মন্ত্রী-এমপি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছেন, যা সরকারের দুর্বল অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির লোকজনকে বেছে বেছে বসানো হচ্ছে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা প্রশ্ন তোলেন, একটি সাংবিধানিক পদে থেকে কীভাবে তিনি বলতে পারেন যে বিএনপির প্রার্থী জয়ী না হলে উন্নয়নের বরাদ্দ দেওয়া হবে না। তিনি এটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়া তিনি দাবি করেন, দেশে চাঁদাবাজি, মাদক, দখলদারি ও দুর্নীতির দায় সরকার বিরোধী দলের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এসব বিষয়ে সমালোচনা করলেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হলে তা ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই প্রকাশ ঘটাবে। তবে এসব প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা হরতাল-অবরোধ করেনি, গাড়িতে আগুন দেয়নি কিংবা ভাঙচুর চালায়নি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। আওয়ামী লীগ আমলের পুলিশি ও গোয়েন্দা কাঠামোর বড় কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি। এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বিরোধী দলকে দায়ী করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ করছেন।
দেশের অর্থনৈতিক সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে চলে গেছে এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় বিরোধী দলকে দায়ী না করে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, গত সাত-আট মাসে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ করা হলেও বিরোধী দল কখনোই অরাজকতা বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়নি। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। অথচ বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন থামাতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দাবি পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব।
গণভোট নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের চারটি প্রশ্নে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও তখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফলে এই রায় মেনে নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংস্কার কমিশনে গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সংসদে গণভোটের রায় বাতিল করার অর্থ হবে জুলাইয়ের চেতনাকে অস্বীকার করা।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত নেতা বলেন, শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে জামায়াত ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা চিকিৎসা ও সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। যারা জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে, তারা গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। সরকারের ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগকে আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তা সত্ত্বেও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা সহিংস আন্দোলনের পথে যায়নি।
অনুষ্ঠানে লেবার পার্টিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, নানাবিধ প্রলোভন ও তদবিরের চাপে অনেক রাজনৈতিক দল নতি স্বীকার করলেও লেবার পার্টি আদর্শের সঙ্গে আপস করেনি। এই অনুষ্ঠানে ১১ দলের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেন এবং নিজ নিজ বক্তব্য তুলে ধরেন। এ জন্য জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের পক্ষ থেকে দলটিকে ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানান তিনি। তবে নানা প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আপস না করে আধিপত্যবাদবিরোধী ইসলামী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে লেবার পার্টি।
রিপোর্টার নাম: 

























