Hi

০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে গড়ে উঠেছে শিশু কেনাবেচার অবৈধ চক্র

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০১:২৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • ২২ জন দেখেছে

রাজধানীজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শিশু কেনাবেচার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দাপ্তরিক বা আইনি দত্তকের আড়ালে একটি চক্র আলিশান অফিস খুলে এবং হাসপাতালের দেয়ালে বিজ্ঞাপন প্রচার করে বাণিজ্য চালাচ্ছে। সাধারণত বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় থাকা বা সন্তানহীন দম্পতিরাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য। দালাল বা ব্রোকাররা সুকৌশলে বিভিন্ন বয়সী শিশু সরবরাহ করে থাকে। এই চক্রের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে চাহিদা অনুযায়ী শিশু পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। জানা গেছে, ছেলে শিশু হলে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং মেয়ে শিশু হলে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকা হয়। প্রতিটি লেনদেনে ব্রোকাররা ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই গর্ভবতী মায়ের যাবতীয় খরচ বহনের শর্তে শিশু বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্যসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমান সমাজে অনেকেই বাচ্চা হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রমসহ বিভিন্ন কারণেও দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও অনেকে বন্ধ্যত্বতায় ভুগছেন। শুধু ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুই নয়, মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই শিশু বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। কেউ লিখছেন- ‘একটি মেয়ে বাচ্চা চাই’। কেউ আবার বলছেন- ‘সাত মাসের বাচ্চা আছে, ইনবক্সে আসেন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাচ্চা দত্তক নেয়া এবং দেয়ার গ্রুপ’ বা এই জাতীয় নাম ব্যবহার করে শত শত পেজ পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মে ‘আর্জেন্ট বাচ্চা লাগবে’ বা ‘নবজাতক দত্তক দেওয়া হবে’—এমন অসংখ্য পোস্ট দেখা যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব পোস্টে আগ্রহী ক্রেতারা ইনবক্সে যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্রেতারা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চেয়ে আলাপ এগিয়ে নেয়। ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ বা ‘ঐশ্বর্য চৌধুরী ওরিন’-এর মতো আইডি ব্যবহার করে চলে এই দরদাম। এমন একটি গ্রুপে ৩ বছর বয়সী ছেলে শিশু বিক্রির জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এক নারী বিক্রেতা। তিনি জানান, তার বোনের সন্তানের ভরণপোষণ সম্ভব নয় বলেই এই পথ বেছে নিয়েছেন এবং সব কিছু স্ট্যাম্পে লিখে দেওয়া হবে। এসব পোস্টের নিচে অনেকে কমেন্টস করছেন-বয়স কতো লাগবে।

হাসপাতালকেও এই চক্রটি তাদের বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এক যুবক নিজেকে চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দুটি নবজাতকের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সে জানায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তানগুলোকে ভালো পরিবারে দেওয়ার নাম করে মেডিকেল বিলের বিনিময়ে তারা শিশু হস্তান্তর করে। আইনি জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে দাবি করে যে, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে দেওয়ার পর আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ও বিদেশে বাচ্চা পাঠানোর দাবিও করে এই চক্র। তারা গর্ভ ভাড়া বা ‘সারোগেসি’র মাধ্যমেও সন্তান দেওয়ার কথা প্রচার করে। কানাডায় বাচ্চা পাঠানোর কথা বলে এক গ্রাহকের কাছ থেকে শিশু হস্তান্তরের উদাহরণও তারা গর্বের সাথে উল্লেখ করে। সরকারি স্ট্যাম্পের ওপর উভয় দাতা ও গ্রহীতার নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে এফিডেভিট ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয় শিশু।

আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিশু কেনাবেচা বা অর্থের বিনিময়ে শিশুকে চিরতরে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুর ওপর নিষ্ঠুরতা, অবহেলা বা শোষণের যেকোনো প্রচেষ্টাই দণ্ডনীয় অপরাধ। আদালতে বৈধতা নেই এমন কোনো স্ট্যাম্প বা নোটারি কাগজ তৈরি করে শিশু আদান-প্রদানকে আইন কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয় না। ইউনিসেফের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ শীর্ষক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার এবং ঝুঁকিপ্রবণ শিশুদের জন্য কার্যকর সামাজিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দত্তকের নামে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে এভাবে সরাসরি শিশু বিক্রির বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, বিষয়টি যেহেতু তাদের নজরে এসেছে, তাই তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ চলছে।

জনপ্রিয়
© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

রাজধানীতে গড়ে উঠেছে শিশু কেনাবেচার অবৈধ চক্র

আপডেট : ০১:২৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শিশু কেনাবেচার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দাপ্তরিক বা আইনি দত্তকের আড়ালে একটি চক্র আলিশান অফিস খুলে এবং হাসপাতালের দেয়ালে বিজ্ঞাপন প্রচার করে বাণিজ্য চালাচ্ছে। সাধারণত বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় থাকা বা সন্তানহীন দম্পতিরাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য। দালাল বা ব্রোকাররা সুকৌশলে বিভিন্ন বয়সী শিশু সরবরাহ করে থাকে। এই চক্রের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে চাহিদা অনুযায়ী শিশু পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। জানা গেছে, ছেলে শিশু হলে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং মেয়ে শিশু হলে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকা হয়। প্রতিটি লেনদেনে ব্রোকাররা ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই গর্ভবতী মায়ের যাবতীয় খরচ বহনের শর্তে শিশু বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্যসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমান সমাজে অনেকেই বাচ্চা হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রমসহ বিভিন্ন কারণেও দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও অনেকে বন্ধ্যত্বতায় ভুগছেন। শুধু ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুই নয়, মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই শিশু বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। কেউ লিখছেন- ‘একটি মেয়ে বাচ্চা চাই’। কেউ আবার বলছেন- ‘সাত মাসের বাচ্চা আছে, ইনবক্সে আসেন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাচ্চা দত্তক নেয়া এবং দেয়ার গ্রুপ’ বা এই জাতীয় নাম ব্যবহার করে শত শত পেজ পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মে ‘আর্জেন্ট বাচ্চা লাগবে’ বা ‘নবজাতক দত্তক দেওয়া হবে’—এমন অসংখ্য পোস্ট দেখা যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব পোস্টে আগ্রহী ক্রেতারা ইনবক্সে যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্রেতারা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চেয়ে আলাপ এগিয়ে নেয়। ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ বা ‘ঐশ্বর্য চৌধুরী ওরিন’-এর মতো আইডি ব্যবহার করে চলে এই দরদাম। এমন একটি গ্রুপে ৩ বছর বয়সী ছেলে শিশু বিক্রির জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এক নারী বিক্রেতা। তিনি জানান, তার বোনের সন্তানের ভরণপোষণ সম্ভব নয় বলেই এই পথ বেছে নিয়েছেন এবং সব কিছু স্ট্যাম্পে লিখে দেওয়া হবে। এসব পোস্টের নিচে অনেকে কমেন্টস করছেন-বয়স কতো লাগবে।

হাসপাতালকেও এই চক্রটি তাদের বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এক যুবক নিজেকে চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দুটি নবজাতকের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সে জানায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তানগুলোকে ভালো পরিবারে দেওয়ার নাম করে মেডিকেল বিলের বিনিময়ে তারা শিশু হস্তান্তর করে। আইনি জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে দাবি করে যে, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে দেওয়ার পর আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ও বিদেশে বাচ্চা পাঠানোর দাবিও করে এই চক্র। তারা গর্ভ ভাড়া বা ‘সারোগেসি’র মাধ্যমেও সন্তান দেওয়ার কথা প্রচার করে। কানাডায় বাচ্চা পাঠানোর কথা বলে এক গ্রাহকের কাছ থেকে শিশু হস্তান্তরের উদাহরণও তারা গর্বের সাথে উল্লেখ করে। সরকারি স্ট্যাম্পের ওপর উভয় দাতা ও গ্রহীতার নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে এফিডেভিট ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয় শিশু।

আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিশু কেনাবেচা বা অর্থের বিনিময়ে শিশুকে চিরতরে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুর ওপর নিষ্ঠুরতা, অবহেলা বা শোষণের যেকোনো প্রচেষ্টাই দণ্ডনীয় অপরাধ। আদালতে বৈধতা নেই এমন কোনো স্ট্যাম্প বা নোটারি কাগজ তৈরি করে শিশু আদান-প্রদানকে আইন কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয় না। ইউনিসেফের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ শীর্ষক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার এবং ঝুঁকিপ্রবণ শিশুদের জন্য কার্যকর সামাজিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দত্তকের নামে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে এভাবে সরাসরি শিশু বিক্রির বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, বিষয়টি যেহেতু তাদের নজরে এসেছে, তাই তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ চলছে।