রাজধানীর মিরপুরে হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সে নিয়মনীতিহীন দোকান ভাড়া ও চাঁদাবাজির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মাজার কর্তৃপক্ষের নথিতে যেসব দোকান ‘ফাঁকা’ বা বরাদ্দবিহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব স্থানেও চলছে রমরমা ব্যবসা। আড়ত কমপ্লেক্সটির মোট ৫১৬টি দোকানের মধ্যে ৪৪টি দোকানকে কেন্দ্র করে এই অনিয়ম চলছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, যার বার্ষিক পরিমাণ প্রায় চার কোটি টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাজার সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আড়তের নিয়ন্ত্রণে আগের রাজনৈতিক প্রভাব পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব বেড়েছে। আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা–কর্মীরা। অবশ্য রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আগের বরাদ্দধারীদের কেউ কেউ তাঁদের দোকানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।
মাজার ও ব্যবসায়ী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মোট ৫০৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বাকি ৮টির মধ্যে ৩টির পজেশন থাকলেও কোনো কাঠামো নেই, আর ৫টি দোকান কখনো বরাদ্দই দেওয়া হয়নি। কাগজে ফাঁকা থাকা ৪৪টি দোকানের তালিকায় এই পাঁচটি ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বরাদ্দ বাতিল হওয়া ৩৬টি দোকান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব দোকানের তালিকায় সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের দুটি এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান খানের একটি দোকানও রয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বরাদ্দহীন এসব দোকানে একাধিক ব্যবসায়ী ভাগাভাগি করে ব্যবসা করছেন, অনেকের কাছে দোকানের নম্বর পর্যন্ত নেই। তা ছাড়া এ তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের (মাসুম) দুটি এবং সাভারের কাউন্দিয়ার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান খানের একটি দোকান। ১ ও ৩ অক্টোবর সরেজমিন দেখা যায়, ফাঁকা হিসেবে দেখানো দোকানগুলোর জায়গায় ব্যবসা চলছে। একই নম্বরে একাধিক দোকান, আবার অনেক দোকানে নম্বরই নেই।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, দোকান ভাড়া ছাড়াও দোকানের সামনে পণ্য রাখার জন্য ‘ফুট ভাড়া’ নামক অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।
দোকান পেতে মাজার কর্তৃপক্ষ ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা জামানত এবং আকারভেদে তিন থেকে সাত হাজার টাকা ‘মাটি ভাড়া’ নির্ধারণ করলেও, বাস্তবে বরাদ্দধারীরা দোকানগুলো অন্যের কাছে ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় উপভাড়া দিচ্ছেন।
এতে মাজার কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। ৩৯৮ নম্বর দোকানের আড়তদার মো. পান্নাসহ একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মাজারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী ইয়াসিন আরাফাতের কাছে তাঁরা নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করছেন। তবে ইয়াসিন আরাফাত এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি এর সঙ্গে যুক্ত নন; ব্যবসায়ীরা আগের মালিকদের থেকেই দোকান ভাড়া নিয়েছেন।
অনিয়মের শিকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগের তীর স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দিকে। উদাহরণস্বরূপ, ৩১২/১ ও ৩১২/২ নম্বর দোকানের কলার ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান জানান, তিনি মো. দেলোয়ার নামের একজনকে প্রতি দোকান বাবদ ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দেন। একইভাবে সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের ১৯৮ নম্বর দোকানটি পাঁচ ভাগ করে চালানো হচ্ছে, যেখানে প্রতি আড়তদার দৈনিক ৮০০ টাকা করে ভাড়া দিচ্ছেন। ১৯৮ ও ২০০ নম্বর দোকানটি দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শ্যামল আহমেদ রাসেলের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করে একে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। ৩১২/১ নম্বর দোকানের বরাদ্দধারী মো. বদিউজ্জামানের কাছে মাজারের পাওনা ৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
১৯ নম্বর দোকানের আড়তদার আলফাজ উদ্দিন জানান, তার দোকানের মাসিক ভাড়া এক লাখ টাকা। একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য হাফিজুল হাসান ওরফে ‘কানা শুভ্র’ এই দোকানের ভাড়ার টাকা সংগ্রহ করেন। যদিও হাফিজুল হাসান আড়তে নিজের কোনো দোকান থাকা বা ভাড়া আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, ৪৫২, ৪৫৩ ও ৪৫৪ নম্বর দোকানের আগের মালিক মো. সোহান দাবি করেছেন, তিনি বরাদ্দ বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি পাননি, ফলে এখন ভাড়া পাচ্ছেন না। অথচ এসব দোকান ভাড়া নেওয়া ফিরোজ আলম তালুকদার দাবি করেছেন, তিনি নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করছেন। এভাবেই অস্পষ্ট বরাদ্দ ও রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে মাজারের আড়ত কমপ্লেক্সে চলছে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মহোৎসব।
রিপোর্টার নাম: 

























