ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তরে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি সরকারি প্রশাসনিক ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে প্রধান কার্যালয়সহ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল এবং নতুন প্রশাসনিক নকশার একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে দ্রুত পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ১৯৭৫ সালের ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন’ অনুযায়ী পরিচালিত এই সংস্থার সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা হলো বোর্ড অব গভর্নরস। কিন্তু এটি অধিদপ্তর হিসেবে পুনর্গঠিত হলে বোর্ড অব গভর্নরসের বিদ্যমান কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে সকল নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজেট তৈরি ও মূল কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। তবে আমরা এটাকে অধিদপ্তর করার প্রক্রিয়াও শুরু করছি। বোর্ড অব গভর্নরসের মতামত ও অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। ফলে কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসন থাকলেও বাস্তবে সরকারের প্রভাব এড়ানো কঠিন।
কর্মকর্তাদের মতে, অধিদপ্তরে পরিণত হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতা কমে আসবে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত জবাবদিহিতা যেমন জোরদার হবে, তেমনি বাজেট অনুমোদন, প্রকাশনা কিংবা গবেষণা কাজের গতিও বাড়বে। এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদের সভার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা নিয়মিত না বসায় অতীতে অনেক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংস্থা অধিশাখার যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তর করতে কোনো পৃথক নতুন আইন তৈরির বাধ্যবাধকতা নেই। মন্ত্রিসভার প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এই রূপান্তর সম্ভব। তবে বর্তমান আইনি কাঠামো রহিত করা প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, ফাউন্ডেশনকে দ্রুত তাদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং তারা পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এটি চূড়ান্ত করছে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও প্রয়োজন হবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত একটি সেলের সপ্তম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জার ১০ লাখের বেশি ধর্মীয় সেবকের জন্য সম্মানিলব্ধ ভাতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তর করার সুপারিশ সামনে আসে।
দীর্ঘদিন ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের সরকারি সুবিধা ও পূর্ণাঙ্গ পেনশনের নিশ্চয়তার জন্য এটিকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক বহু কর্মীকে কীভাবে রাজস্ব খাতের আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সুগম হতে পারে। তবে সম্প্রতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেলের সপ্তম সভায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে ২ হাজার ৩১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এছাড়া ভাতা ও সম্মানীর ভিত্তিতে আরও ৭১ হাজার ১৮৫ জন সহ মোট ৮৪ হাজার ২৫৩ জন ব্যক্তি সংযুক্ত আছেন। রূপান্তরের পর রাজস্ব খাতে কতসংখ্যক পদ চূড়ান্তভাবে যুক্ত হবে, তা পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী জানান, এটি সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করতে বলায় সেই অনুযায়ী কাজ চলছে। রূপরেখাটি পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে নতুন এই ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো স্বায়ত্তশাসিত সুবিধা ভোগ করবে না।
বর্তমানে ফাউন্ডেশন সরকারি অনুদানের পাশাপাশি নিজস্ব বিভিন্ন উৎস থেকে আয় করে থাকে এবং সেই তহবিল ব্যয়ের স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার অধীনে সমস্ত আয় ও ব্যয় পরিচালিত হবে। এতে প্রতিষ্ঠানটিকে আর আলাদা করে নিজস্ব রাজস্ব বা আয় তৈরির ওপর নির্ভর করতে হবে না, বরং সরাসরি সরকারি বাজেট বরাদ্দ লাভ করবে।
প্রশাসনিক পর্যায়ে অনেকেই মনে করছেন যে, তাত্ত্বিকভাবে স্বায়ত্তশাসন কার্যকর একটি ব্যবস্থা হলেও দেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এমন সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নানামুখী সরকারি প্রভাবের মুখেই পড়ে। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে এই সংস্থার কার্যক্রম পৌঁছানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আরও উল্লেখ করেন, অধিদপ্তর হলে কর্মকর্তাদের চাকরির স্থায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা অনেক বৃদ্ধি পাবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল দাবি পূরণ হবে যার মাধ্যমে তারা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সাথে নিজস্ব আয়ের কোনো চিন্তা আর তাদের ওপর বর্তাবে না।
যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম যুক্ত করেন, বর্তমানে প্রকাশনা থেকে শুরু করে বাজেট পাসের জটিলতা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, অধিদপ্তর হওয়ার পর প্রশাসনিক অনুমোদনগুলো দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত প্রস্তাব এখনো মন্ত্রণালয়ে জমা না হলেও শিগগিরই ফাউন্ডেশন পর্ষদের মতামত নিয়ে এটি জমা দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রস্তাব নিয়ে বোর্ডের বৈঠক কবে হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।’।
রিপোর্টার নাম: 






















