ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য আজকের দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে আজ পার্লামেন্ট বা নেসেট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা নেতানিয়াহুর ক্ষমতার টিকে থাকা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইসরায়েলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে অগ্নিপরীক্ষা আজ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। গাজা ও ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর আজ ইসরায়েলে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে জিতলে গাদি আইজেনকটকে ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন মালি হাজাজ।
নির্বাচন স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার নেসেটের ১২০ জন প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোট দিচ্ছেন। কিন্তু এবারের হিসাব–নিকাশ এতটাও সোজা হবে না।
নিয়ম অনুযায়ী, ইসরায়েলের ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তারা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। কোনো দলকে সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ৬১টি আসন পেতে হয় এবং পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করতে হয়। জোট সরকার চালিয়ে ইসরায়েলের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও ছিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৬১টি আসনে জয় পেতে হবে। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন হয়। তত দিন নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালাতে হবে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি এবার ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শিবিরের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে লড়ছে। তার সরকারের প্রধান শরিকদের মধ্যে রয়েছে ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে এই দুই নেতার ওপর বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরেরই তাঁর প্রতি সমর্থন রয়েছে।
বিরোধী শিবিরে রয়েছেন গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটসদের সমন্বয়ে গঠিত জোট। সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ আইজেনকট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচক। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভীতি ছড়ানো এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলেছেন। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। এরপর নেতানিয়াহুর হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল। দুই দশক ইসরায়েল শাসনের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের নেতৃত্বের ক্যারিশমা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৪৮ সালে। সেটা তখনই সম্ভব হবে, যদি তিনি (নেতানিয়াহু) ক্ষমতায় থাকেন। নেতানিয়াহু আর আইজেনকট—কারও জন্যই ক্ষমতার পথ সুগম নয়।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—যুদ্ধের সময় তার নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন। নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার শাসনামলেই ট্রাম্প ইরানের হুমকির বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। তবে আইজেনকটের মতে, ট্রাম্প ইসরায়েলের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে কোনো নেতার সঙ্গেই কার্যকরভাবে কাজ করবেন। নেতানিয়াহু গত রোববার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের হুমকিকে ‘চিরতরে মুখে ফেলার’ জন্য আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছেন। নেতানিয়াহু থাকছেন নাকি বিদায় নিচ্ছেন, রায় আজ।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে গভীর বিভাজন ও অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় নিয়ে নেতানিয়াহুর ওপর চরম জনরোষ রয়েছে। অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, নেতানিয়াহু দেশের ভাবমূর্তির বড় ক্ষতি করেছেন। অন্যদিকে, লিকুদ পার্টির সমর্থক নফ গাবে-এর মতো অনেকে মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। এ দুটি যুদ্ধ দেশে–বিদেশে নেতানিয়াহুকে যেমন চরম সমালোচিত করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলকে কার্যত একা করে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকে ৭ অক্টোবরের ওই হামলার দিনে ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায়ভার নির্ধারণ করার বিষয়টি সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি ফৌজদারি মামলাও চলমান রয়েছে, যা তার জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আজকের নির্বাচনে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আমোতজ এসা-এল সতর্ক করেছেন যে, নির্বাচনের ফল যেদিকেই যাক, সরকার গঠন প্রক্রিয়া খুবই জটিল হবে।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের প্রচলিত রাজনৈতিক চিন্তাধারার মতোই ফিলিস্তিনি ইস্যুতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ঘোর বিরোধী। তবে তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করে আসছেন, যা অনেক পশ্চিমা মিত্রের কাছে ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে।
আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ভোটাররা এবার নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন বলে অনেকে ধারণা করছেন। যদিও আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন, তবু বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো পরোক্ষ সমর্থন দিতে পারে। নির্বাচনের প্রাক্কালে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলো বলছে, কঠিন চাপে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু।
আজকের নির্বাচনে যদি কোনো জোটই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী বছরেই দেশটিতে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে নেতা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রিপোর্টার নাম: 
























