লুঙ্গি – গেঞ্জি পরা এক শিক্ষক দুই হাতে ধরা মোটা একটি লাঠি দিয়ে ৮-৯ বছরের এক শিশুকে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। হাত ক্লান্ত হয়ে পড়লে মারলেন লাথি। এরপর শিশুর সামনে বসে তার মুখে-পেটে ঘুষির পর ঘুষি চালালেন। একই বয়সী কতগুলো শিশু লাইন বেঁধে বসে আতঙ্ক নিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই বর্বর দৃশ্যটি দেখেছেন অসংখ্য মানুষ; আমিও দেখেছি। এই ভয়াবহ চিত্র কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশের বিভিন্ন কওমি ও আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর চলা দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক নির্মম প্রামাণ্য দলিল। শিশুটির কান্নাকাটি বা আকুতি সেই শিক্ষকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি, উল্টো হিংস্রতার চরম রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে। শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া; ২। অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হলেও মাত্র দুই মাস পর জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন নামে আরেকটি মাদ্রাসা খুলে বসেন; তা-ও আবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল কয়েকজন বিকৃত মানুষের নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা।
বাস্তবতা হলো, এই দৃশ্য অনেকের কাছেই নতুন নয়। অতীতেও গৌরনদী মাদ্রাসা-মসজিদের দোতলায় মুফতি হুজুরকে দুই হাতে বাঁশের মোটা লাঠি নিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছোট ছোট শিশুদের পেটাতে দেখা গেছে। সে সময় অন্যান্য শিশুরা পরম আতঙ্ক নিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে সেই নির্যাতন প্রত্যক্ষ করত। মনে পড়ে, হুজুরের ছুড়ে মারা বেতের আগা নেয়ামতের ঊরুতে এসে গেঁথে গিয়েছিল এবং মুহূর্তেই রক্তে ভিজে গিয়েছিল ছেলেটির পায়জামা। আবার কখনো হেফজখানার এক মাথা থেকে ছুড়ে মারা ভারী তালা এসে লেগেছে অন্য শিশুর মাথায়। এর ফলে শিশুরা যন্ত্রণায় ছটফট করলেও নির্যাতনের এই ধারা অব্যাহত থাকত। প্রাচীনকাল থেকেই অভিভাবকেরা সন্তানকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসতেন এই বলে—‘হুজুর, গোশত আপনার, আর হাড্ডি আমার।’ আর হুজুরের হাতের লাঠিটি ছিল আসলে রান্নাঘরের বিশাল ডেগের তরকারি নাড়ানোর হাতা।
এই ধারণার সুযোগ নিয়ে কিছু শিক্ষক শিক্ষাদানের নামে শিশুদের ওপর চরম অমানুষিকতা চালিয়েছেন। এতে শিক্ষকেরা যে অনুশোচনা বোধ করতেন তা নয়; বরং বর্তমানে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে দেখা যায় এক শিক্ষক বাচ্চার মুখে বেত দিয়ে খোঁচা মারছেন এবং সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। তবে শুধু শারীরিক শাস্তি দেওয়াই এখন একমাত্র অপরাধ নয়। সামাজিক মাধ্যমের টুকরা টুকরা আলাপের গণ্ডি পেরিয়ে এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও উঠে আসছে কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের কঠিন বাস্তবতা। এখন মহিলা মাদ্রাসায় ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাও সামনে আসছে; এমনকি উঠে আসছে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যার গুরুতর অভিযোগও। নিপীড়নের পর হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার পরিবেশ তৈরি করা, ৫। ছাত্রদের অপরাধ ছিল—ফুটবল বিশ্বকাপের সময় তারা টেলিভিশনে খেলা দেখতে গিয়েছিল। এতে যে শিক্ষকেরা খুব দুঃখিত হতেন তা নয়; বরং সম্প্রতি টিকটকে যেমন ভেসে বেড়াচ্ছে—এক শিক্ষক বাচ্চার মুখে বেত দিয়ে খোঁচা মারছেন এবং ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, ‘বাচ্চাদের কান্না করাতে ভালোই লাগে’—ঠিক তেমনই আমাদের শিক্ষকেরাও ছাত্রদের দেওয়া শাস্তি নিয়ে নানান। ধারণা করি, আমাদের সময়ে শিক্ষক কর্তৃক নিপীড়নের ঘটনা শোনেনি, এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না।
যেমন গত ১৯ মে দেশব্যাপী রামিসা হত্যাকাণ্ডের আলোচনার দিনই আমরা দেখলাম বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের শিশু আবদুল্লাহর ঝুলন্ত লাশ, যার পায়ুপথে ছিল যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত। টাঙ্গাইল সদরের একটি মাদ্রাসায় ৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর যৌন হেনস্তার ঘটনাও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে অভিভাবকের অভিযোগ ছিল, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শিশুদের জিনের ভয় দেখিয়ে শরীরের সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ করতেন এবং তা মুঠোফোনে ধারণের নির্দেশ দিতেন। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে। দেখলাম কুমিল্লার এক মহিলা মাদ্রাসায় একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যু, যার ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে নির্যাতনের চিহ্ন। নিখোঁজ সংবাদ: মাদ্রাসার শিশু–কিশোরের সংখ্যা কেন বেশি। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রে’র (আসক) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরই মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে অন্তত ৫২ জন শিশু, যাদের মধ্যে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতিতে কেবল একটি সংখ্যা বলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
মাদ্রাসায় সংঘটিত শিশু নিপীড়নের অপরাধমূলক বিন্যাস
আইন ও অপরাধবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দিন দিন বেড়ে চলা মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নিপীড়নের ঘটনায় অনেকগুলো গুরুতর অপরাধের বিন্যাস ঘটেছে। দেশের বিদ্যমান দণ্ডবিধি অনুযায়ী এর প্রতিটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দিন দিন বেড়ে মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নিপীড়নের ঘটনায় অনেকগুলো অপরাধের বিন্যাস ঘটেছে: ১।
- শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া
- ছেলেশিশুকে ধর্ষণ করা
- মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করা
- নিপীড়নের পর হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার পরিবেশ তৈরি করা
- শিশু নিপীড়নের দৃশ্য রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা
- শিশুর ছবি/ভিডিও নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যসহ ছড়িয়ে দেওয়া। এর প্রতিটিই বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
বিচারহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর সংস্কৃতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইন থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগের চিত্র পুরোই উল্টো—‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া’র ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। বেফাকের প্রধান পরিচালক মাওলানা নদভীকে এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এমন ঘটনা ঘটার কথা নয় এবং বোর্ড এসব বরদাশত করে না। কিন্তু এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, গত তিন মাসে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ৫৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫২টিই মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক। যদিও তিনি নিজের এই দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিরপেক্ষ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
তবে ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি’র দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, শিশু নিপীড়নের সিংহভাগ ঘটে পরিবারে বা পরিচিত পরিবেশে। মাদ্রাসার পাশাপাশি স্কুল, এতিমখানা এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও শিশু নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। অপরাধবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হলো ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি থিওরি’। এটি বলে, যেকোনো অপরাধ ঘটার জন্য তিনটি উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হয়—একজন সম্ভাব্য অপরাধী, একজন সম্ভাব্য শিকার বা লক্ষ্য এবং কোনো উপযুক্ত অভিভাবক বা সুরক্ষাকারীর অনুপস্থিতি। মাদ্রাসার পাশাপাশি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গৃহশিক্ষকদের হাতেও শত শত শিশু নিপীড়িত হচ্ছে। অপরাধী সচেতন বা অবচেতনভাবে এটাকেই হিসেবে ব্যবহার করে।
শিশুদের আবাসিক হেফজখানা বা মাদ্রাসার বিদ্যমান কাঠামো এই তিনটি শর্তকেই অস্বাভাবিকভাবে সহজ করে দেয়। শিশুটি পরিবার থেকে দূরে এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে; সেখানে তদারকি ব্যবস্থা একজন শিক্ষকের হাতেই ন্যস্ত। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহজাত দোষ নয়—যেকোনো বদ্ধ, তদারকহীন ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেই এই ঝুঁকি হু হু করে বাড়ে, যেমনটি বিশ্বজুড়ে এতিমখানা, বোর্ডিং স্কুল বা খেলাধুলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও দেখা যায়। একইভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগের ঝুঁকিও বাস্তব। কিন্তু কাঠামোগত ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও তা প্রশমনের ব্যবস্থা না নেওয়াটাই বড় দায় তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘মোরাল লাইসেন্সিং’ দিয়ে। ধর্মীয় পরিচয় একজন মানুষকে সমাজের চোখে এমন এক জ্যোতির্বলয় এনে দেয়, যার কারণে মানুষ তাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে সহজে আমল দিতে চায় না। টাঙ্গাইলের যে মাদ্রাসায় শিক্ষক শিশুদের ‘জিনের ভয়’ দেখিয়ে স্পর্শ করতেন, সেটিও এমন এক ধ্রুপদি কৌশল। এখানে ভীতি ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব মিলাইয়ে শিশুকে চরমভাবে জিম্মি করা হতো।
এখানে দাঁড়িয়ে বেফাকের ‘প্রোপাগান্ডা’ বক্তব্যকে সুবিচারের সঙ্গে পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থাকে কালিমালিপ্ত করতে করা হতে পারে—এই আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক নয়। কিন্তু তাই বলে ঢালাওভাবে সব ঘটনাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল বোর্ডের কাজ হতে পারে না। দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় ‘পবিত্রতার ভার’। কোনো প্রতিষ্ঠান যত বেশি ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক হয়ে ওঠে, তার সমালোচনাকে তত বেশি প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে মূল অপরাধ ঢেকে যায় এবং ভুক্তভোগী শিশুরা বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এই আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক নয়, কোনো কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ভুল–বোঝাবুঝি থেকেও আসতে পারে—যেমনটা ৭ বছর জেল খেটে আসা নেত্রকোনার নিরপরাধ শিক্ষক মোজাফ্ফরের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। জোব্বা-টুপি, কোরআনের হাফেজ কিংবা ‘হুজুর’ পরিচয়—এসব সমাজে গভীর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। আর যখন সত্য প্রকাশ পেয়েই যায়, তখন প্রতিষ্ঠান যদি শিশুর কথা বিশ্বাস না করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বার আঘাত পায়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শিশুকে বেধড়ক মারধরের সেই শিক্ষককে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো শক্ত নজির কি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ স্থাপন করতে পেরেছে? বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া বা সালিসের নামে অপরাধীকে পার পাইয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাদ্রাসায় নিপীড়নের এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, অন্যান্য দেশেও একই ধরনের চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমন পাকিস্তানে ২০২১ সালে মুফতি আজিজুর রহমান নামের এক শীর্ষ শিক্ষকের ধর্ষণের ভিডিও ফাঁসের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থার (এসিইআরডব্লিউসি) রায়ের পর রাষ্ট্র দারাগুলোকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় এনে ‘আধুনিক দারা’ গড়ার কর্মসূচি শুরু করে। এই ভুল–বোঝাবুঝিই সমালোচককে থামিয়ে দেয় আর অপরাধীকে দেয় নির্বাধ সুযোগ।
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকায় শিক্ষক নিয়োগে কোনো পূর্ব-রেকর্ড বা ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই হয় না, মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ নেই এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর সুরক্ষা বিধান তদারকির কোনো স্বাধীন প্রক্রিয়া সেখানে অনুপস্থিত। এই আইনি ও প্রশাসনিক শূন্যতা দূর করা এখন সময়ের দাবি। ধর্মীয় শিক্ষার সুমহান ঐতিহ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। রাসুল (সা.) ছোট শিশুদের প্রতি সর্বোচ্চ স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েকজন কিশোর-তরুণ তাঁর কাছে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য এলে তিনি তাদের সর্বোচ্চ ২০ দিন থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং পরিবারে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আর আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো’ (সহিহ্ মুসলিম, হাদিস: ৬৩১)। তাহলে ৬ থেকে ১০ বছরের শিশুদের বছরের পর বছর আবদ্ধ কামরায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার আয়োজন কীভাবে ন্যায়সংগত হতে পারে?
এই শূন্যতা পূরণে এবং শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কওমি মাদ্রাসা বোর্ডে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন এখন অপরিহার্য।
মাদ্রাসা সংস্কার ও কলাম লেখকের তথ্য
- লেখক পরিচয়: মনযূরুল হক, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, ধর্ম বিভাগ,।
- যোগাযোগ ইমেইল: [email protected]
- মতামত নির্দেশিকা: প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি।
পরিশেষে, কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষার জন্য প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মীদের অতীত রেকর্ড যাচাই, একান্তে সাক্ষাৎ সীমিত করার নীতিমালা, গোপন অভিযোগের হটলাইন এবং বোর্ড-স্বীকৃত স্বাধীন শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। আলেমসমাজ ও পরিচালনা পর্ষদ এগিয়ে না এলে এই নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রিপোর্টার নাম: 

























