দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক পর্যালোচনা চলছে, যেখানে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই পর্যবেক্ষণ করছেন।
জ্বালানি খাতের এই নাজুক অবস্থার পেছনে দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতি, মাত্রাতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দায়ী। এছাড়া একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে পড়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জনগণের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বর্তমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও অনিয়মের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন। সংকট কাটাতে তিনি বিরোধী পক্ষকেও একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের নতুন মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খনন এবং তিনটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও, তা বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক ১১০ কোটি এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে আরও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। এছাড়া সমুদ্র ও স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার সময়সীমা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত।
বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাটারিসহ সোলার প্যানেল স্থাপনকারী উদ্যোক্তারা প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ পাবেন। সরকারের লক্ষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া। পাশাপাশি পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি সময়ে লোডশেডিং কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেল ও এলপিজি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রেও সরকার তৎপর। দেশে বর্তমানের ৩২ দিনের তেলের মজুত ধীরে ধীরে ৯০ দিনে উন্নীত করা হবে। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে, যার জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সরবরাহের অংশ হিসেবে বিপিসিকে মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহেশখালী, কাট্টলী, মাতারবাড়ী, মোংলা ও অ্যালেঙ্গায় নতুন এলপিজি ডিপো স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং প্রয়োজনীয় আমদানির ওপর সমান্তরাল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ খাতে অতীতের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ব্যয় সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক চাপে ফেলেছে। পাশাপাশি গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক বিঘ্নিত হয়েছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ খাতের জন্য গ্যাসের সরবরাহ ২০২২ সালের দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে বর্তমানে ৮৭ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে ৭০ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্যের প্রভাব মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকার বিপুল আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। তেল আমদানিতে সরকারের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা এবং এলএনজি ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার দেশীয় অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর সমন্বিত কৌশলে এগোচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বার্ষিক দেড় কোটি টন কয়লা আমদানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের বর্তমান লক্ষ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারের নেওয়া ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি আমদানির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিদ্যুৎ খাতে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সরকারকে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে তেল কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় সরকারের লোকসান ইতোমধ্যে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 























