Hi

০৬:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্দী অং সান সু চির সাথে রেড ক্রস প্রতিনিধির সাক্ষাৎ: আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও জান্তার কৌশল

মিয়ানমারের আটক সাবেক নেত্রী অং সান সু চির সাথে আজ সোমবার (৩ আগস্ট, ২০২৬) আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) একজন প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হয়েছে। দেশটির সামরিক সরকার এই বৈঠকের দাবি করেছে, যা সু চির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। রাজধানী নেপিদোতে আইসিআরসি-র আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দে বেকের সঙ্গে সু চির এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সরকারের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই তিনি আটক রয়েছেন। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থা এবং ঠিক কোথায় তাকে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতা বা কূটনীতিক প্রকাশ্যে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি, যা তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক জান্তার পক্ষ থেকে এই বৈঠকের আয়োজনকে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেন তারা দেখাতে পারে যে সু চি তাদের তত্ত্বাবধানে সুস্থ আছেন।

সরকারের মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামের মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, আজ নেপিদোতে মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দে বেকের সঙ্গে অং সান সু চির দেখা হয়েছে। এই সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, এবং আইসিআরসি-র পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সু চির ছেলে কিম অ্যারিস তার মায়ের জীবিত থাকার প্রমাণ চেয়ে বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার মায়ের জীবিত থাকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ এখনো না পাওয়ায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন। গত এপ্রিলের শেষে জান্তা সরকার সু চিকে গোপন কারাগার থেকে গৃহবন্দী করার ঘোষণা দিলেও অ্যারিস এটিকে প্রকৃত স্বাধীনতা মানতে নারাজ। তার মতে, “আমার নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ৮১ বছর বয়সী মাকে এক গোপন স্থান থেকে আরেক গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়াকে স্বাধীনতা বলা যায় না। তিনি এখনো জিম্মি।” কিম অ্যারিস ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপনের পরিবর্তে মানবাধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অং সান সু চির বিরুদ্ধে সামরিক আদালত বিভিন্ন অভিযোগে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে দুটি সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির আওতায় তার সাজা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয় এবং তাকে নির্জন কারাবাস থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী হিসেবে রাখা হয়। এই পদক্ষেপগুলোও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মতো একটি নিরপেক্ষ সংস্থার প্রতিনিধির এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিআরসি সাধারণত যুদ্ধবন্দী এবং আটক ব্যক্তিদের মানবিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে থাকে এবং তাদের পরিবার ও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। এই বৈঠকের মাধ্যমে সু চির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে, যদিও আইসিআরসি তার অনুসন্ধানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে, কারণ এটি মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিরল স্বচ্ছতার মুহূর্ত।

তবে, এই বৈঠক সু চির নিঃশর্ত মুক্তি বা মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে কিনা, তা বলা কঠিন। গত এপ্রিলের শেষ দিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আয়োজিত এক বিতর্কিত নির্বাচনের পর সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশের প্রেসিডেন্ট হন, যাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায়শই অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছে। সু চির সাথে রেড ক্রস প্রতিনিধির এই বৈঠক এমন এক সময়ে ঘটলো যখন জান্তা সরকার তাদের ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। এই বৈঠক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ নিরসনে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সু চির ছেলে এবং অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীরা তার নিঃশর্ত মুক্তি এবং দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে অবিচল রয়েছেন। মিয়ানমারের ভবিষ্যত এখনও অনিশ্চয়তায় ঘেরা, যেখানে মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা গভীরভাবে প্রোথিত।

জনপ্রিয়

রূপপুরে মদ্যপান নিয়ে দুই রুশ নাগরিকের মারামারি: হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজনের মৃত্যু

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

বন্দী অং সান সু চির সাথে রেড ক্রস প্রতিনিধির সাক্ষাৎ: আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও জান্তার কৌশল

আপডেট : ০২:১৫:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

মিয়ানমারের আটক সাবেক নেত্রী অং সান সু চির সাথে আজ সোমবার (৩ আগস্ট, ২০২৬) আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) একজন প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হয়েছে। দেশটির সামরিক সরকার এই বৈঠকের দাবি করেছে, যা সু চির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। রাজধানী নেপিদোতে আইসিআরসি-র আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দে বেকের সঙ্গে সু চির এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সরকারের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই তিনি আটক রয়েছেন। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থা এবং ঠিক কোথায় তাকে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতা বা কূটনীতিক প্রকাশ্যে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি, যা তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক জান্তার পক্ষ থেকে এই বৈঠকের আয়োজনকে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেন তারা দেখাতে পারে যে সু চি তাদের তত্ত্বাবধানে সুস্থ আছেন।

সরকারের মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামের মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, আজ নেপিদোতে মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দে বেকের সঙ্গে অং সান সু চির দেখা হয়েছে। এই সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, এবং আইসিআরসি-র পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সু চির ছেলে কিম অ্যারিস তার মায়ের জীবিত থাকার প্রমাণ চেয়ে বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার মায়ের জীবিত থাকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ এখনো না পাওয়ায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন। গত এপ্রিলের শেষে জান্তা সরকার সু চিকে গোপন কারাগার থেকে গৃহবন্দী করার ঘোষণা দিলেও অ্যারিস এটিকে প্রকৃত স্বাধীনতা মানতে নারাজ। তার মতে, “আমার নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ৮১ বছর বয়সী মাকে এক গোপন স্থান থেকে আরেক গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়াকে স্বাধীনতা বলা যায় না। তিনি এখনো জিম্মি।” কিম অ্যারিস ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপনের পরিবর্তে মানবাধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অং সান সু চির বিরুদ্ধে সামরিক আদালত বিভিন্ন অভিযোগে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে দুটি সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির আওতায় তার সাজা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয় এবং তাকে নির্জন কারাবাস থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী হিসেবে রাখা হয়। এই পদক্ষেপগুলোও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মতো একটি নিরপেক্ষ সংস্থার প্রতিনিধির এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিআরসি সাধারণত যুদ্ধবন্দী এবং আটক ব্যক্তিদের মানবিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে থাকে এবং তাদের পরিবার ও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। এই বৈঠকের মাধ্যমে সু চির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে, যদিও আইসিআরসি তার অনুসন্ধানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে, কারণ এটি মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিরল স্বচ্ছতার মুহূর্ত।

তবে, এই বৈঠক সু চির নিঃশর্ত মুক্তি বা মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে কিনা, তা বলা কঠিন। গত এপ্রিলের শেষ দিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আয়োজিত এক বিতর্কিত নির্বাচনের পর সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশের প্রেসিডেন্ট হন, যাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায়শই অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছে। সু চির সাথে রেড ক্রস প্রতিনিধির এই বৈঠক এমন এক সময়ে ঘটলো যখন জান্তা সরকার তাদের ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। এই বৈঠক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ নিরসনে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সু চির ছেলে এবং অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীরা তার নিঃশর্ত মুক্তি এবং দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে অবিচল রয়েছেন। মিয়ানমারের ভবিষ্যত এখনও অনিশ্চয়তায় ঘেরা, যেখানে মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা গভীরভাবে প্রোথিত।