পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হতে যাচ্ছে। পাওয়ার প্ল্যান্টটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে পরিচালনকারী ও কারিগরি কর্তৃপক্ষ। আগামী মাসেই এই পরীক্ষণমূলক সঞ্চালন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক দেশগুলোর ক্লাবে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সরাসরি পূর্ণ ক্ষমতায় শুরু করা হয় না। শুরুতেই ফিজিক্যাল স্টার্টআপ ও পাওয়ার স্টার্টআপের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত বা সিনক্রোনাইজ করা হয়। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিক ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে সিস্টেমের স্থিতিশীলতা, ট্রান্সমিশন লাইনের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো খতিয়ে দেখা হবে। সফল পরীক্ষণ শেষে পর্যায়ক্রমে এই সক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন নিশ্চিত করার পরেই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক উৎপাদন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ইতিহাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় পদ্মা নদীর তীরে দুটি ইউনিটে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এই ভিভিইআর প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চমাত্রার সুরক্ষাব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম, যা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বাহ্যিক বিদ্যুৎ বা মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই রিঅ্যাক্টরকে দীর্ঘ সময় নিরাপদ রাখতে সক্ষম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় হাই-ভোল্টেজ ট্রান্সমিশন লাইন এবং প্রয়োজনীয় সাব-স্টেশন নির্মাণের কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা নদী অতিক্রমকারী মেগা ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ এবং রূপপুর থেকে ঢাকা ও সংলগ্ন এলাকার দিকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো প্রস্তুত করায় গ্রিড সংযোগ স্থাপনে কোনো বড় কারিগরি বাধা নেই। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর তদারকি ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা পুরোপুরি মেনে সব ধরনের ভৌত ও কারিগরি পরীক্ষা পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আশা, পরীক্ষামূলক সরবরাহ পুরোপুরি সফল হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণমাত্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে চালুর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি জীবাশ্ম জ্বালানি তথা আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর দেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সাথে এটি পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি সঞ্চার করবে।
রিপোর্টার নাম: 



















