Hi

১২:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তীব্র দাবদাহে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড, জনজীবন বিপর্যস্ত

দেশজুড়ে চলমান তীব্র দাবদাহের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চিত্র আরও প্রকট, যেখানে কিছু এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া বিদ্যুৎ বিভ্রাট ভোর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী জানান, সারা রাত বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ছে তার দৈনন্দিন কাজে। একই বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং ফ্রিজে রাখা পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। এদিকে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানায়, সামনে টেস্ট পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

ফেনীর দাগনভূঞার পরিস্থিতি আরও নাজুক। সেখানে সরকারি শিডিউল মানা হচ্ছে না এবং গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ অফিসের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় গ্রাহকদের প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, তারা চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় সরকারি শিডিউল বজায় রাখতে পারছে না। সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের জায়গায় এখন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখতে হচ্ছে, যা গরম বাড়লে আরও ১-২ ঘণ্টা বৃদ্ধি পায়।

মাদারীপুরের চিত্রও একই। শহর থেকে গ্রাম—কোথাও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি নেই। দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। রংয়ের ছোঁয়া প্রেসের মালিক রুবেল মাতুব্বর জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা তাকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৫২ মেগাওয়াট। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় লোডশেডিং সমন্বয় করছে।

তীব্র গরমের মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্করা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিদ্যুৎ বিভাগ কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের ওপর ভিত্তি করেই তারা লোডশেডিংয়ের সময়সূচি নির্ধারণ করছেন। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কোনো শিডিউলই কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।

একই ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।

গ্রাহকরা অতিষ্ঠ হয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস বা উপকেন্দ্রে অথবা অভিযোগ অফিসগুলোতে ফোন করলে কেউ রিসিভও করছে না।

কোথাও একবার গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও আসছে না।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকেই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়ে, যা চলে ভোর পর্যন্ত।

শরীর এত দুর্বল লাগে যে সকালে কাজে যাওয়া সম্ভব হয় না।

একদিন কাজ না করলে ঘরে চাল ওঠে না, পরিবার নিয়ে এখন কী করব বুঝতে পারছি না।

মোমবাতি বা কুপির আলোতে তীব্র গরমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

জনপ্রিয়

তীব্র দাবদাহে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড, জনজীবন বিপর্যস্ত

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

তীব্র দাবদাহে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড, জনজীবন বিপর্যস্ত

আপডেট : ১২:৩০:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

দেশজুড়ে চলমান তীব্র দাবদাহের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চিত্র আরও প্রকট, যেখানে কিছু এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া বিদ্যুৎ বিভ্রাট ভোর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী জানান, সারা রাত বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ছে তার দৈনন্দিন কাজে। একই বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং ফ্রিজে রাখা পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। এদিকে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানায়, সামনে টেস্ট পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

ফেনীর দাগনভূঞার পরিস্থিতি আরও নাজুক। সেখানে সরকারি শিডিউল মানা হচ্ছে না এবং গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ অফিসের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় গ্রাহকদের প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, তারা চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় সরকারি শিডিউল বজায় রাখতে পারছে না। সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের জায়গায় এখন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখতে হচ্ছে, যা গরম বাড়লে আরও ১-২ ঘণ্টা বৃদ্ধি পায়।

মাদারীপুরের চিত্রও একই। শহর থেকে গ্রাম—কোথাও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি নেই। দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। রংয়ের ছোঁয়া প্রেসের মালিক রুবেল মাতুব্বর জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা তাকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৫২ মেগাওয়াট। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় লোডশেডিং সমন্বয় করছে।

তীব্র গরমের মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্করা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিদ্যুৎ বিভাগ কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের ওপর ভিত্তি করেই তারা লোডশেডিংয়ের সময়সূচি নির্ধারণ করছেন। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কোনো শিডিউলই কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।

একই ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।

গ্রাহকরা অতিষ্ঠ হয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস বা উপকেন্দ্রে অথবা অভিযোগ অফিসগুলোতে ফোন করলে কেউ রিসিভও করছে না।

কোথাও একবার গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও আসছে না।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকেই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়ে, যা চলে ভোর পর্যন্ত।

শরীর এত দুর্বল লাগে যে সকালে কাজে যাওয়া সম্ভব হয় না।

একদিন কাজ না করলে ঘরে চাল ওঠে না, পরিবার নিয়ে এখন কী করব বুঝতে পারছি না।

মোমবাতি বা কুপির আলোতে তীব্র গরমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত