Hi

১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনা: নিরাপত্তা ঘাটতি ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন

দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে অ্যাডভেঞ্চারমূলক পর্যটনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে খুলনার এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এই অনিরাপত্তা ও উদাসীনতারই নগ্ন প্রকাশ। নিহত ওই তরুণের নাম শৌভিক রায়, যিনি আকাশে কয়েকশ ফুট ওপরে ওঠার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে দ্রুত উদ্ধার বা জীবন রক্ষাকারী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের সবচেয়ে বড় এই পর্যটন জনপদে দীর্ঘদিন ধরে চলা নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবেরই একটি করুণ পরিণতি।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও এর আশেপাশের এলাকায় অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্যারাসেইলিং, জেট স্কি এবং স্পিডবোট রাইডের মতো রোমাঞ্চকর খেলাগুলো। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব সেবা প্রদানকারী বেশিরভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে না। কেবল আর্থিক মুনাফা অর্জনের অন্ধ লোভে তারা পর্যটকদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ঘটনার দিনটিতেও প্রতিকূল আবহাওয়া বা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কীভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ রাইড চালু রাখা হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে, আকাশে ওড়ার সময় প্যারাসেইলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ধরনের উন্নত প্রযুক্তির হারনেস, প্রশিক্ষিত অপারেটর, তাৎক্ষণিক উদ্ধারকারী জলযান এবং আধুনিক লাইফগার্ডিং টিমের প্রয়োজন হয়, তার সিকিভাগও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের কাছে থাকে না।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হলেও দায়িত্বশীল মহলের মতে, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবেই এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এর আগেও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় পর্যটকরা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু অতীতের সেই ঘটনাগুলো থেকে কোনো ধরনের কঠোর শিক্ষা নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে এসব অবৈধ ও অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার পরেই কেবল প্রশাসন সাময়িক সময়ের জন্য তৎপর হয় এবং লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং একে একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে কেবল ‘দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা গ্রহণের’ এই পুরোনো সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি পর্যটন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়ার আগে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনবলের দক্ষতা এবং জরুরি উদ্ধার প্রস্তুতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি, সৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসহ জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, বারবার এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি দেশের পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং পর্যটকদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে।

জনপ্রিয়

সিলেটের জৈন্তাপুরের মিনাটিলা: মেঘ-পাহাড়ের মিতালীতে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনা: নিরাপত্তা ঘাটতি ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন

আপডেট : ০৯:২২:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে অ্যাডভেঞ্চারমূলক পর্যটনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে খুলনার এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এই অনিরাপত্তা ও উদাসীনতারই নগ্ন প্রকাশ। নিহত ওই তরুণের নাম শৌভিক রায়, যিনি আকাশে কয়েকশ ফুট ওপরে ওঠার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে দ্রুত উদ্ধার বা জীবন রক্ষাকারী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের সবচেয়ে বড় এই পর্যটন জনপদে দীর্ঘদিন ধরে চলা নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবেরই একটি করুণ পরিণতি।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও এর আশেপাশের এলাকায় অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্যারাসেইলিং, জেট স্কি এবং স্পিডবোট রাইডের মতো রোমাঞ্চকর খেলাগুলো। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব সেবা প্রদানকারী বেশিরভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে না। কেবল আর্থিক মুনাফা অর্জনের অন্ধ লোভে তারা পর্যটকদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ঘটনার দিনটিতেও প্রতিকূল আবহাওয়া বা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কীভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ রাইড চালু রাখা হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে, আকাশে ওড়ার সময় প্যারাসেইলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ধরনের উন্নত প্রযুক্তির হারনেস, প্রশিক্ষিত অপারেটর, তাৎক্ষণিক উদ্ধারকারী জলযান এবং আধুনিক লাইফগার্ডিং টিমের প্রয়োজন হয়, তার সিকিভাগও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের কাছে থাকে না।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হলেও দায়িত্বশীল মহলের মতে, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবেই এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এর আগেও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় পর্যটকরা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু অতীতের সেই ঘটনাগুলো থেকে কোনো ধরনের কঠোর শিক্ষা নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে এসব অবৈধ ও অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার পরেই কেবল প্রশাসন সাময়িক সময়ের জন্য তৎপর হয় এবং লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং একে একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে কেবল ‘দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা গ্রহণের’ এই পুরোনো সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি পর্যটন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়ার আগে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনবলের দক্ষতা এবং জরুরি উদ্ধার প্রস্তুতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি, সৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসহ জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, বারবার এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি দেশের পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং পর্যটকদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে।