Hi

১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের গান ও শিল্পভিত্তিক অভিনব প্রতিবাদ

ডিজিটাল যুগে সাইবার বুলিং ও মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষক সমাজ এক অনন্য ও নান্দনিক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেছে। আশির দশকের জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সরব উপস্থিতি এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত জুলাই মাসে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি সাদামাটা রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। নীল শাড়ি পরে স্কুলে হাঁটার ওই ভিডিওটিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল গানটি। কিন্তু সাইবার জগতের একাংশ তা ভালোভাবে নেয়নি এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে একধরনের মোরাল পুলিশিং বা নৈতিকতার বিচার শুরু করে। একজন নারী শিক্ষক কেন রঙিন পোশাক পরবেন বা বৃষ্টির দিনে নিজের আনন্দের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করবেন—এই প্রশ্ন তুলে তাঁর চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষকতার যোগ্যতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

তবে এই ডিজিটাল হেনস্তার মুখে পড়ে শিক্ষকেরা কোনো ধরনের ভাঙচুর, রাজপথের অবরোধ বা হিংসাত্মক কর্মসূচি বেছে নেননি। পরিবর্তে তাঁরা প্রতিবাদের জন্য শিল্প ও নান্দনিকতাকে বেছে নেন। রাজধানী ঢাকাসহ বগুড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গানের সঙ্গে নিজেদের রিল ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করতে শুরু করেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষিকাদের পাশাপাশি পুরুষ সহকর্মীরাও এই সংহতি মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। গোপালগঞ্জের এক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৈরি ভিডিওর ক্যাপশনে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, অভিনয় ও খেলাধুলা শেখানো এবং এর আনন্দ ভাগ করে নেওয়া একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্বেরই অংশ। বরিশালের এক শিক্ষক সমুদ্রসৈকতে হেঁটে যাওয়ার ভিডিও পোস্ট করে প্রশ্ন তোলেন যে, শিশুরা নাচ-গান শিখলে শিক্ষক কেন তা প্রকাশ করতে পারবেন না।

সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের মতে, প্রতিবাদের এই রূপটি ‘অ্যাস্থেটিকস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিবাদের সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফরাসি দার্শনিক জাক র‍্যানসিয়ের এবং মার্কিন নারীবাদী চিন্তাবিদ বেল হুকস বারবার দেখিয়েছেন যে, শোষিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শিল্পচর্চা এবং সৌন্দর্যের প্রকাশ একধরনের শক্তিশালী প্রতিরোধ। বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নারীদের ওপর অনলাইন ও অফলাইনে উগ্রবাদী আচরণের যে প্রবণতা দেখা গেছে, শিক্ষকদের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ তার বিরুদ্ধে একটি শৈল্পিক জবাব। প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবমূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধার সংকটের শিকার হয়ে আসছেন। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে আনন্দময় ও খেলাচ্ছলে পাঠদানের যে সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তা আমাদের সমাজে বারবার বাধার সম্মুখীন হয়। শিক্ষকের ব্যক্তিজীবনকে ধর্মীয় বা সামাজিক রক্ষণশীলতার নিক্তিতে মেপে আক্রমণ করা কেবল সেই ব্যক্তির ওপর নয়, বরং কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপরও এক ধরনের বড় আঘাত।

নাগরিক স্বাধীনতা ও সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণ বিধিমালার প্রসঙ্গ টেনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের সরব উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা কিংবা ২০১৯ সালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকায় দায়িত্বশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ বা শৈল্পিক অভিব্যক্তির ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে বিউটি রানী পাল বা অন্য কোনো শিক্ষক কোনো বিধি লঙ্ঘন করেছেন—এমন কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বরং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা ও নাগরিক অধিকার চর্চার এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ দেশের শিক্ষক সমাজকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের এই শান্ত অথচ জোরালো শৈল্পিক প্রতিবাদ দেশের সংস্কৃতিচর্চাকে কোণঠাসা করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী ও প্রেরণাদায়ক নজির হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয়

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নের প্রতিবাদে ষষ্ঠ দিনেও শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন, মশাল মিছিল ও গণসংগীত

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের গান ও শিল্পভিত্তিক অভিনব প্রতিবাদ

আপডেট : ০৯:২২:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

ডিজিটাল যুগে সাইবার বুলিং ও মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষক সমাজ এক অনন্য ও নান্দনিক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেছে। আশির দশকের জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সরব উপস্থিতি এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত জুলাই মাসে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি সাদামাটা রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। নীল শাড়ি পরে স্কুলে হাঁটার ওই ভিডিওটিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল গানটি। কিন্তু সাইবার জগতের একাংশ তা ভালোভাবে নেয়নি এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে একধরনের মোরাল পুলিশিং বা নৈতিকতার বিচার শুরু করে। একজন নারী শিক্ষক কেন রঙিন পোশাক পরবেন বা বৃষ্টির দিনে নিজের আনন্দের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করবেন—এই প্রশ্ন তুলে তাঁর চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষকতার যোগ্যতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

তবে এই ডিজিটাল হেনস্তার মুখে পড়ে শিক্ষকেরা কোনো ধরনের ভাঙচুর, রাজপথের অবরোধ বা হিংসাত্মক কর্মসূচি বেছে নেননি। পরিবর্তে তাঁরা প্রতিবাদের জন্য শিল্প ও নান্দনিকতাকে বেছে নেন। রাজধানী ঢাকাসহ বগুড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গানের সঙ্গে নিজেদের রিল ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করতে শুরু করেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষিকাদের পাশাপাশি পুরুষ সহকর্মীরাও এই সংহতি মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। গোপালগঞ্জের এক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৈরি ভিডিওর ক্যাপশনে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, অভিনয় ও খেলাধুলা শেখানো এবং এর আনন্দ ভাগ করে নেওয়া একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্বেরই অংশ। বরিশালের এক শিক্ষক সমুদ্রসৈকতে হেঁটে যাওয়ার ভিডিও পোস্ট করে প্রশ্ন তোলেন যে, শিশুরা নাচ-গান শিখলে শিক্ষক কেন তা প্রকাশ করতে পারবেন না।

সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের মতে, প্রতিবাদের এই রূপটি ‘অ্যাস্থেটিকস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিবাদের সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফরাসি দার্শনিক জাক র‍্যানসিয়ের এবং মার্কিন নারীবাদী চিন্তাবিদ বেল হুকস বারবার দেখিয়েছেন যে, শোষিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শিল্পচর্চা এবং সৌন্দর্যের প্রকাশ একধরনের শক্তিশালী প্রতিরোধ। বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নারীদের ওপর অনলাইন ও অফলাইনে উগ্রবাদী আচরণের যে প্রবণতা দেখা গেছে, শিক্ষকদের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ তার বিরুদ্ধে একটি শৈল্পিক জবাব। প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবমূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধার সংকটের শিকার হয়ে আসছেন। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে আনন্দময় ও খেলাচ্ছলে পাঠদানের যে সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তা আমাদের সমাজে বারবার বাধার সম্মুখীন হয়। শিক্ষকের ব্যক্তিজীবনকে ধর্মীয় বা সামাজিক রক্ষণশীলতার নিক্তিতে মেপে আক্রমণ করা কেবল সেই ব্যক্তির ওপর নয়, বরং কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপরও এক ধরনের বড় আঘাত।

নাগরিক স্বাধীনতা ও সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণ বিধিমালার প্রসঙ্গ টেনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের সরব উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা কিংবা ২০১৯ সালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকায় দায়িত্বশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ বা শৈল্পিক অভিব্যক্তির ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে বিউটি রানী পাল বা অন্য কোনো শিক্ষক কোনো বিধি লঙ্ঘন করেছেন—এমন কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বরং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা ও নাগরিক অধিকার চর্চার এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ দেশের শিক্ষক সমাজকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের এই শান্ত অথচ জোরালো শৈল্পিক প্রতিবাদ দেশের সংস্কৃতিচর্চাকে কোণঠাসা করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী ও প্রেরণাদায়ক নজির হয়ে থাকবে।