দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা সামলাতে হাল আমলের তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ বেছে নিচ্ছে উদ্ভাবনী নানা পথ। সেই ধারায় রূপচর্চা ও সাজসজ্জার গণ্ডি পেরিয়ে ফ্যাশন অনুষঙ্গ এখন হয়ে উঠেছে মানসিক স্বস্তি প্রকাশের মাধ্যম। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি’ বা ফিজেট গয়না। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো সাধারণ আংটি, ব্রেসলেট কিংবা নেকলেসের মতো মনে হলেও, সেগুলোর বিশেষ নকশা ব্যবহারকারীকে দুশ্চিন্তার মুহূর্তে সাময়িক প্রশান্তি জোগাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এতে এমন কিছু স্পর্শনির্ভর বা চলমান উপাদান থাকে, যা আঙুল দিয়ে অনায়াসে ঘুরানো, চাপ দেওয়া বা নাড়ানো যায়। এই ধরনের গয়নার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে ‘স্পিনার রিং’, যার বাইরের অংশটি মূল কাঠামো থেকে আলাদাভাবে ঘোরে। এছাড়া যুক্ত হয়েছে ‘ব্রিদিং নেকলেস’, যার ফাঁপা পেনডেন্টের নকশা ব্যবহারকারীকে ধীর ও ছন্দময়ভাবে শ্বাস ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে। একই সাথে খাঁজযুক্ত আংটি ও পুঁতিবিশিষ্ট ব্রেসলেটও বেশ সমাদৃত হচ্ছে। এগুলো প্রথাগত গয়নার মতোই নান্দনিক হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে সবার নজর না কেড়েও অনায়াসে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানসিক অস্থিরতা বা উদ্বেগের সময়ে অনেক মানুষ অজান্তেই হাত-পা নাড়ানো, নখ কামড়ানো কিংবা কলম ঘোরানোর মতো আচরণ করে থাকেন, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘ফিজেটিং’ বলা হয়। অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি গয়নাগুলো মানুষের এই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত আচরণকেই একটি রুচিশীল ও গ্রহণযোগ্য রূপ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটকে ‘কমফোর্ট নেকলেস’ সংক্রান্ত বিভিন্ন ট্রেন্ড তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রিয় কোনো অনুষঙ্গ স্পর্শ করা মানসিক স্থিতি বা স্বস্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ‘গ্রাউন্ডিং অবজেক্ট’ হিসেবে কাজ করে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
তবে চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এই ধরনের গয়না কোনোভাবেই স্থায়ী চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের বিকল্প নয়। চিকিৎসকদের মতে, পুনরাবৃত্তিমূলক এসব স্পর্শ বা নাড়াচড়া সাময়িকভাবে মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাকের জটিল সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকলে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এছাড়া অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) কিংবা বডি-ফোকাসড রিপিটেটিভ বিহেভিয়ার (বিএফআরবি)-এ আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বারবার একই কাজ করার প্রবণতা উল্টো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকে তাকালে দেখা যায়, অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি গয়নার কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র মতামত রয়েছে। ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলের একটি ল্যাব গবেষণায় দাবি করা হয়, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্পিনার রিং ব্যবহারে অংশগ্রহণকারীদের উদ্বেগের মাত্রা গড়ে প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এফআইটি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বেঙ্কেনডর্ফ মনে করেন, ফিজেট অনুষঙ্গগুলো সরাসরি মানসিক চাপ কমায়—এমন জোরালো ও সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণের এখনো অভাব রয়েছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক জুয়েলারি ব্র্যান্ডগুলো স্টেইনলেস স্টিল, রুপা, এমনকি সোনার প্রলেপ দেওয়া ধাতুর সাহায্যে মিনিমালিস্ট নকশার ফিজেট গয়না বাজারজাত করছে। ফলে এটি আধুনিক ফ্যাশনের পাশাপাশি সুস্থতার একটি অনুষঙ্গ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা পরিষ্কার—অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারিকে একটি স্টাইলিশ ও সাময়িক মানসিক প্রশান্তির সরঞ্জাম হিসেবে গ্রহণ করা গেলেও এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়; দীর্ঘস্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পেশাদার অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।
রিপোর্টার নাম: 























