নান্দনিকতা, আধুনিক জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে বাংলাদেশে রঙের বাজার এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। অতীতে বাসাবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দেয়াল রাঙাতে কেবল সাধারণ রঙের ব্যবহারই প্রচলিত ছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে মানুষের রুচি ও নান্দনিক ভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন আর কেবল দেয়াল ঢেকে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য নয়; রঙের ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব, পরিবেশবান্ধব পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতিফলনই হয়ে উঠেছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ক্রেতাদের এই চাহিদার বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে দেশে গড়ে উঠেছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার এক বিশালাকার ও সুসংগঠিত রঙের বাজার। সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক বিষয় হলো, এই দেশীয় শিল্প এখন আর কেবল নিজস্ব সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; মানসম্মত রঙ প্রস্তুত করে স্থান করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারেও।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক নির্মাণশিল্পে বর্তমানে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব রঙের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ঘরের ভেতরের আর্দ্রতা দূর করতে স্যাঁতসেঁতে-প্রতিরোধী পেইন্টের কদর বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ফলে বাজারে অ্যালার্জিমুক্ত, ক্ষতিকর রাসায়নিকহীন, দুর্গন্ধহীন এবং সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্য উন্মোচিত হয়েছে। শুধু সমতল রঙের বদলে বাসাবাড়িতে টেক্সচার পেইন্ট, মেটালিক ফিনিশ এবং কাঠ সুরক্ষার জন্য তৈরি বিশেষ উডেন শেডের ব্যবহার নতুন নান্দনিক মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে রঙের জগতে যোগ হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অগমেন্টেড রিয়ালিটি (এআর) ভিত্তিক কালার প্রিভিউ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে রঙের চূড়ান্ত প্রয়োগের আগেই গ্রাহকরা দেয়ালের দৃশ্যমান রূপ কেমন হবে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। অন্যদিকে শিল্প স্থাপনা ও ধাতব অবকাঠামো দীর্ঘস্থায়ী করতে জারা-প্রতিরোধী কোটিংয়ের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্ত ভিত্তির ওপর ভর করে বাংলাদেশি রঙ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রপ্তানি বাণিজ্যেও মনোযোগ দিচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে এই খাত থেকে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। প্রাথমিক পর্যায়ে এই অঙ্কটি খুব বড় মনে না হলেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি রঙের বিপুল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই চিত্র। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে দেশীয় কারখানাগুলো অর্জন করছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বীকৃতি ও মানসনদ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা আইএসও (ISO), সৌদি আরবের সাসো (SASO) এবং মালয়েশিয়ার সিরিম (SIRIM)-এর মতো কঠোর মানের সার্টিফিকেট অন্যতম। বাংলাদেশের মতো একই রকম জলবায়ু রয়েছে এমন অঞ্চলগুলোকেই মূল আন্তর্জাতিক বাজার হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে জলযান সুরক্ষার মেরিন কোটিং এবং উপকূলীয় এলাকার জন্য লবণাক্ততা-প্রতিরোধী রঙের বিশেষ চাহিদা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী খাতের বাইরে গিয়ে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে রঙের মতো বহুমুখী পণ্যের সংযোজন অত্যন্ত অর্থবহ। দেশে দ্রুত গতিতে বেড়ে চলা আবাসন খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে এ খাতের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিজস্ব গবেষণা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক বিপণন ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের এই রঙের বাজার ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান নিশ্চিত করতে পারবে।
রিপোর্টার নাম: 






















