বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্প ও ফটোগ্রাফির রূপকার আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগের এক কালজয়ী শিল্পকর্ম নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন শিল্প ও আলোকচিত্র বোদ্ধারা। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) থেকে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘ফটোগ্রাফি ডাইজেস্ট’ গ্রন্থে সংরক্ষিত একটি ব্যতিক্রমী স্ট্রিট ফটোগ্রাফি স্থান পেয়েছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পী ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মাঝারি ফরম্যাটের ক্যামেরায় তোলা এই সাদাকালো ছবিতে ধরা পড়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী ঢাকা শহরের অবকাঠামোগত বিবর্তন, নগর জীবনের ক্লান্তি এবং অসাধারণ শিল্পরস।
ঐতিহাসিক সেই আলোকচিত্রে দেখা যায়, দুপুরের রোদে ঢাকার এক ফাঁকা রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে পয়োনিষ্কাশনের বিশালাকার সিমেন্টের পাইপ। পাইপের ভেতরের ছায়াঘেরা স্থানে বিশ্রাম নিচ্ছেন দুই শ্রমজীবী মানুষ, আর পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলে যাচ্ছে নির্মাণসামগ্রীবাহী একটি ট্রাক। পাইপের বৃত্তাকার মুখের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করা দুপুরের আলো ও ছায়ার যে বক্রাকার খেলা তৈরি হয়েছে, তা দেখতে অবিকল আধফোটা গোলাপের পাপড়ির মতো। বস্তুগতভাবে কঠিন ও শীতল পাইপগুলোর ভেতরে প্রাণের এই উপস্থিতি সাধারণ নাগরিক দৃশ্যকে এক অনন্য শিল্পকর্মে রূপ দিয়েছে।
চিত্রকর্মটির নান্দনিক দিক বিশ্লেষণ করে প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় জানান, আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি বিষয়কে ক্যামেরার ফ্রেমে অসাধারণ করে তোলাই একজন মহৎ আলোকচিত্রীর সার্থকতা। পয়োনিষ্কাশনের পাইপগুলোর সর্পিলাকার বিন্যাস ও মাঝের অন্ধকার কেন্দ্রটি প্রস্ফুটিত সতেজ গোলাপের গঠনের সঙ্গে তুলনীয়। আলোকচিত্রীর দেখার বিশেষ ক্ষমতা ছিল বলেই বাস্তবতার রুক্ষ ক্যানভাসে এমন একটি কোমল শিল্পরূপ ফুটে উঠেছে, যা দর্শকের মনে বিশেষ এক অনুভূতির সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’র অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল হক অমি প্রথাগত স্ট্রিট ফটোগ্রাফির গণ্ডি ভাঙার বিচারে ছবিটিকে মূল্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, স্ট্রিট ফটোগ্রাফি সাধারণত মুহূর্ত ও কম্পোজিশনকেন্দ্রিক হলেও মনজুর আলম বেগের এই কাজটিতে জীবন সংগ্রাম, বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি এবং নাগরিক জীবনচক্রের এক গভীর দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। অবরুদ্ধ পাইপের ভেতরে মানুষ আর পাশে চলমান বাহন একাধারে বন্দিদশা ও গতির বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলে, যা আলোকচিত্রীকে শুধু একজন পর্যবেক্ষণকারী নয়, একজন দক্ষ গল্পকার হিসেবে উপস্থাপন করে।
বাংলাদেশের আলোকচিত্র আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মনজুর আলম বেগ যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা চিত্রকলায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অবদানের সমতুল্য। তিনি একাধারে নিজে ছবি তুলেছেন, লিখেছেন এবং নতুন প্রজন্মকে আলোকচিত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষক ও সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের আক্ষেপ, বাংলা আলোকচিত্রের এই নক্ষত্রতুল্য প্রতিষ্ঠাতার অনেক বিরল ও ক্ষমতাশালী কাজ এখনও তরুণ প্রজন্মের আড়ালেই রয়ে গেছে। তাঁর সৃষ্টিশীল কাজগুলো আরও ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে আনা সম্ভব হলে দেশের ফটোগ্রাফির চর্চা ও গতিপথ আরও সমৃদ্ধ হতো বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
নিজস্ব প্রতিনিধি 























