কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত উত্থান বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা জেমিনাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো যখন অবলীলায় লেখালেখি বা ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজগুলো করে ফেলছে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে চারুকলা, সংগীত, নাট্যকলা বা সাহিত্যচর্চার মতো বিষয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এআইয়ের দাপটে হয়তো সৃজনশীল পেশার সঙ্গে জড়িতদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আশঙ্কা অনেকটাই অমূলক, কারণ প্রকৃত সৃজনশীলতা ও মানবিক অনুভব যন্ত্রের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই তার বিশাল ডেটাবেজ থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে নিখুঁত ছবি বা গান তৈরি করতে পারলেও, এর কোনো হৃদয় নেই। বিচ্ছেদ বা বিরহের কষ্ট, বৃষ্টির দিনে এক কাপ চা হাতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার মতো ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো এআইয়ের কাছে দুর্বোধ্য। একজন শিল্পী যখন ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড় দেন, সেই সূক্ষ্ম আবেগ বা কাঁপন যন্ত্র কখনোই নকল করতে পারে না। ঠিক তেমনি মঞ্চে যখন একজন অভিনেতা তার রক্তমাংসের শরীর নিয়ে দাঁড়ান, তার চোখের জল বা গলার কাঁপুনি সরাসরি দর্শকের হৃদয়ে যে আলোড়ন তোলে, তা সিলিকন চিপের পক্ষে তৈরি করা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলেছেন, ‘নয়নসম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’ – এমন গভীর মানবীয় বোধ কোনো রোবটের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
বিশ্ববিখ্যাত রুশ লেখক লিও তলস্তয় তার ‘হোয়াট ইজ আর্ট?’ বইয়ে শিল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, শিল্পের মূল কাজই হলো একজনের ভেতরের অনুভূতি সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া, যা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও একতা সৃষ্টি করে। এআই প্রযুক্তি হয়তো দুনিয়ার সব তথ্য এনে দিতে পারে, কিন্তু ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিতে পারে না। প্রকৃত অর্থে শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চাই হলো যন্ত্রের ভিড়ে নিজেদের মানবিক সত্তা টিকিয়ে রাখার অন্যতম উপায়। লালন শাহও দেহের ভেতরের ‘অচিন পাখি’র খোঁজ করেছেন, যা কেবল মানুষের তৈরি খাঁটি শিল্পেই প্রাণ খুঁজে পায়, যন্ত্রের যান্ত্রিক সৃষ্টিতে নয়।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতায় সৃজনশীলতার চেয়ে কারিগরি ও মুখস্থ বিদ্যার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। বাবা-মায়েরা সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস ক্যাডার বানানোর স্বপ্নে বিভোর থাকেন, যার ফলে মানবিক গুণাবলি বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। মানবিকতা ও সংবেদনশীলতার অভাবে সমাজ ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে। একটি শিশুর পরীক্ষার খাতায় ১০০-তে ১০০ পাওয়ার চেয়ে তার মনের ভেতর অন্যের প্রতি মায়াবোধ ও মানবিকতা থাকাটা যে বেশি জরুরি, তা আমরা ভুলতে বসেছি। সমাজের এই শুষ্কতা দূর করতে শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
তবে উন্নত বিশ্বের শিক্ষাপদ্ধতি এক্ষেত্রে ভিন্ন পথ দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) বা হার্ভার্ডের মতো প্রযুক্তি ও ব্যবসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবল ‘এসটিইএম’ (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিকস) নয়, ‘এসটিইএএম’ (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্টস, ম্যাথমেটিকস) মডেল অনুসরণ করছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, শুধু কোডিং বা সমীকরণ দিয়ে রোবট বানানো গেলেও, সেই রোবটের নকশা যদি নান্দনিক না হয়, তবে বাজারে তার কোনো চাহিদা থাকে না। লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্ট বা অক্সফোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও পারফর্মিং আর্টস নিয়ে মিলিয়ন ডলারের গবেষণা চলছে। গুগল, অ্যাপল বা পিক্সারের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যখন উচ্চপদে কর্মী নিয়োগ করে, তখন তারা শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রি দেখে না, বরং চারুকলার জ্ঞান, মানব মনোবিজ্ঞানের বোঝাপড়া বা নাট্যকলায় পারদর্শিতা আছে কিনা, তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ এআইয়ের যুগে প্রযুক্তিগত কাজগুলো যন্ত্রই করে দিতে পারে, কিন্তু নতুন ধারণার জন্য সৃজনশীল মানুষের কাছেই ফিরতে হয়।
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে। সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োজিত হলেও তারা আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা থ্রি-ডি ও ডিজিটাল টুলসের ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। শিক্ষাব্যবস্থার গতানুগতিকতা এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের কাজকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার কৌশলের অভাবও একটি বড় কারণ। যদি সৃজনশীল শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ ও কিছুটা কৌশলী হতে পারত, তবে এই এআই যুগে তারাই আধিপত্য বিস্তার করতে পারত। এআই নিজেই কিছু তৈরি করে না; এটি ইন্টারনেটের ডেটা থেকে শেখা সবচেয়ে বড় নকলবাজ। মানুষ যদি নতুন কিছু সৃষ্টি করা বন্ধ করে দেয়, তবে এআইয়ের শেখার জন্য কোনো নতুন তথ্য থাকবে না। চারুকলা, সংগীত, নাট্যকলা বা সৃষ্টিশীল পড়াশোনা মানুষকে প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু ভাবতে শেখায়। আমাদের নিজস্ব লালন, রবীন্দ্রনাথ বা লোকনৃত্যের যে খাঁটি সুবাস ও ঐতিহ্য, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক সৃজনশীল শিক্ষা ও সাধনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এই সুযোগের অভাবে অনেক সৃজনশীল মানুষই দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাই এই রোবটের বাজারে নিজেদের ভেতরের রক্তমাংসের, বিবেকবান মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখলেই জয় নিশ্চিত।
ডেস্ক সংবাদ 























