Hi

১০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেন-জিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইউটিউবের অ্যালগরিদম কি ডিজিটাল ফাঁদ?

  • ডেস্ক সংবাদ
  • আপডেট : ০৯:২০:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৬ জন দেখেছে

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব মানবজীবনের প্রতিটি কোণায় অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি (Gen-Z) গোষ্ঠীর কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে বিনোদন ও তথ্যের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছে। কিন্তু সুস্থ জীবনযাপন ও ফিটনেসের নামে ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কীভাবে কোমলমতি মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (সিসিডিএইচ)-এর একটি গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

গবেষণা পদ্ধতি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর আদলে একটি পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে শরীর গঠন ও ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত কিছু প্রাথমিক ভিডিও দেখার পর ইউটিউবের সাজেস্টেড ভিডিওর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। অ্যালগরিদম এরপর যে ১০০টি ভিডিও সামনে আনে, তার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বা ১০টি ভিডিও ছিল এমন, যা খাদ্যাভ্যাসজনিত মারাত্মক ব্যাধি বা ইটিং ডিসঅর্ডারকে উৎসাহিত করতে পারে। এ ধরনের কনটেন্ট মূলত কিশোর-কিশোরীদের মনে নিজেদের শারীরিক গঠন নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অবশ্য আশার কথা হলো, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। এর আগে ২০২৪ সালে পরিচালিত অনুরূপ একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, প্রতি চারটি সাজেস্টেড ভিডিওর মধ্যে একটি ছিল ক্ষতিকর। বর্তমান পরিসংখ্যানে সেই হার নেমে এসেছে প্রতি দশটিতে একটিতে। ইউটিউব কর্তৃপক্ষ বা এর মূল প্রতিষ্ঠান গুগল দাবি করেছে যে, এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট তাদের নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং গবেষণায় চিহ্নিত হওয়ার পরপরই ভিডিওগুলো প্ল্যাটফর্ম থেকে অপসারণ করা হয়েছে। গুগলের ভাষ্যমতে, কিশোর ব্যবহারকারীরা যখন মানসিক স্বাস্থ্য বা খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করে, তখন তাদের সামনে পেশাদার বিশেষজ্ঞদের তৈরি নির্ভরযোগ্য ও সহায়তামূলক তথ্য তুলে ধরার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে।

পেশাদার গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, কেবল ক্ষতিকর ভিডিও মুছে ফেলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ইউটিউবের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর বিগত দেখার অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ভিডিওগুলো সাজেস্ট করে। এর ফলে একজন কিশোর বা কিশোরী অজান্তেই এমন একটি বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে আটকে যায়, যেখানে বারবার অবৈজ্ঞানিক ডায়েট, অত্যন্ত কম ক্যালরি গ্রহণের পরামর্শ কিংবা অতিরিক্ত রোগা শরীরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। যুক্তরাজ্যের জ্যাজমিন কৌরের বাস্তব জীবন এর একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত হওয়া জ্যাজমিন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সুস্থ হলেও জানান যে, এই অসুস্থতার শুরুটা হয়েছিল মূলত একটি সাধারণ ফিটনেস ভিডিও দেখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তিনি মানসিক শান্তির খাতিরে সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে আসেন এবং বর্তমানে শিশু নার্সিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি এখন বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে কার্যকর হওয়া অনলাইন নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের আত্মক্ষতি বা খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিতে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর। তবে বাস্তবে এর শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে কিশোর-কিশোরী এবং অভিভাবকদেরও সচেতনতার মাত্রা বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, অনলাইন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং কোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট সামনে এলে তাতে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ ক্লিক করা কিংবা ব্লক বা রিপোর্ট করার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সর্বোপরি, ডিজিটাল দুনিয়ায় সৌন্দর্যের একচেটিয়া ও অবাস্তব মানদণ্ড তৈরির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা আবশ্যক। সুস্থতার আসল অর্থ কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক আকৃতি বা ওজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাসই হলো প্রকৃত সৌন্দর্যের মাপকাঠি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু কোন কনটেন্ট আমরা দেখব এবং কোনটিকে বর্জন করব—সেই সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখনও ব্যবহারকারীর নিজের হাতেই সুরক্ষিত রয়েছে।

জনপ্রিয়

খুলনা বৃক্ষমেলায় কোটি টাকার চারা বিক্রি, আকর্ষণের কেন্দ্রে বিদেশি দুর্লভ ফলগাছ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

জেন-জিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইউটিউবের অ্যালগরিদম কি ডিজিটাল ফাঁদ?

আপডেট : ০৯:২০:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব মানবজীবনের প্রতিটি কোণায় অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি (Gen-Z) গোষ্ঠীর কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে বিনোদন ও তথ্যের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছে। কিন্তু সুস্থ জীবনযাপন ও ফিটনেসের নামে ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কীভাবে কোমলমতি মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (সিসিডিএইচ)-এর একটি গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

গবেষণা পদ্ধতি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর আদলে একটি পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে শরীর গঠন ও ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত কিছু প্রাথমিক ভিডিও দেখার পর ইউটিউবের সাজেস্টেড ভিডিওর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। অ্যালগরিদম এরপর যে ১০০টি ভিডিও সামনে আনে, তার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বা ১০টি ভিডিও ছিল এমন, যা খাদ্যাভ্যাসজনিত মারাত্মক ব্যাধি বা ইটিং ডিসঅর্ডারকে উৎসাহিত করতে পারে। এ ধরনের কনটেন্ট মূলত কিশোর-কিশোরীদের মনে নিজেদের শারীরিক গঠন নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অবশ্য আশার কথা হলো, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। এর আগে ২০২৪ সালে পরিচালিত অনুরূপ একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, প্রতি চারটি সাজেস্টেড ভিডিওর মধ্যে একটি ছিল ক্ষতিকর। বর্তমান পরিসংখ্যানে সেই হার নেমে এসেছে প্রতি দশটিতে একটিতে। ইউটিউব কর্তৃপক্ষ বা এর মূল প্রতিষ্ঠান গুগল দাবি করেছে যে, এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট তাদের নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং গবেষণায় চিহ্নিত হওয়ার পরপরই ভিডিওগুলো প্ল্যাটফর্ম থেকে অপসারণ করা হয়েছে। গুগলের ভাষ্যমতে, কিশোর ব্যবহারকারীরা যখন মানসিক স্বাস্থ্য বা খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করে, তখন তাদের সামনে পেশাদার বিশেষজ্ঞদের তৈরি নির্ভরযোগ্য ও সহায়তামূলক তথ্য তুলে ধরার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে।

পেশাদার গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, কেবল ক্ষতিকর ভিডিও মুছে ফেলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ইউটিউবের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর বিগত দেখার অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ভিডিওগুলো সাজেস্ট করে। এর ফলে একজন কিশোর বা কিশোরী অজান্তেই এমন একটি বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে আটকে যায়, যেখানে বারবার অবৈজ্ঞানিক ডায়েট, অত্যন্ত কম ক্যালরি গ্রহণের পরামর্শ কিংবা অতিরিক্ত রোগা শরীরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। যুক্তরাজ্যের জ্যাজমিন কৌরের বাস্তব জীবন এর একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত হওয়া জ্যাজমিন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সুস্থ হলেও জানান যে, এই অসুস্থতার শুরুটা হয়েছিল মূলত একটি সাধারণ ফিটনেস ভিডিও দেখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তিনি মানসিক শান্তির খাতিরে সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে আসেন এবং বর্তমানে শিশু নার্সিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি এখন বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে কার্যকর হওয়া অনলাইন নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের আত্মক্ষতি বা খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিতে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর। তবে বাস্তবে এর শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে কিশোর-কিশোরী এবং অভিভাবকদেরও সচেতনতার মাত্রা বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, অনলাইন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং কোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট সামনে এলে তাতে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ ক্লিক করা কিংবা ব্লক বা রিপোর্ট করার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সর্বোপরি, ডিজিটাল দুনিয়ায় সৌন্দর্যের একচেটিয়া ও অবাস্তব মানদণ্ড তৈরির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা আবশ্যক। সুস্থতার আসল অর্থ কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক আকৃতি বা ওজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাসই হলো প্রকৃত সৌন্দর্যের মাপকাঠি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু কোন কনটেন্ট আমরা দেখব এবং কোনটিকে বর্জন করব—সেই সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখনও ব্যবহারকারীর নিজের হাতেই সুরক্ষিত রয়েছে।