বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিলের বানরুটির ভেতরে ‘ব্লেড’ পাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, রুটি প্রস্তুতের সময় কোনো ত্রুটি ছিল না, বরং শাস্তির ভয়ে এক শিক্ষার্থীর লুকিয়ে রাখা ব্লেড নিয়েই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ওই বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
বুধবার দুপুরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখ তদন্ত প্রতিবেদনটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীমের কাছে হস্তান্তর করেন। এর আগে গত ২২ জুলাই গৌরনদী পৌরসভার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে মিড-ডে মিল হিসেবে বানরুটি বিতরণ করা হয়। এ সময় প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দাবি করে যে, তার ভাগের রুটির মধ্যে একটি ব্লেড পাওয়া গেছে। মুহূর্তের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হলে রুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘আইল্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশন’-এর কারখানা পরিদর্শন এবং উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। আধুনিক ও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে রুটি তৈরি করায় সেখানে কোনো ধাতব বস্তু বা ব্লেড প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই বলে নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া প্যাকেজিংয়ের পূর্বে প্রতিটি রুটি মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়, যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কারখানায় কোনো অনিয়ম ছিল না।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থী ও তার পরিবার এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে ওই ছাত্রী স্বীকার করে যে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ব্লেড আনা নিষিদ্ধ থাকার কারণে সে তার কাছে থাকা একটি ব্লেড শাস্তির ভয়ে রুটির প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল। পরে প্যাকেট খোলার সময় অন্য এক সহপাঠী সেটি দেখতে পায়। কিন্তু বিষয়টি শিক্ষিকাকে জানানোর সুযোগ দেওয়ার আগেই ওই ছাত্রী নিজে থেকেই প্রচার করে যে রুটির ভেতরে ব্লেড পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শারমিন জাহান কোনো প্রকার সত্যতা যাচাই না করেই সেই ব্লেডসহ রুটির ছবি শিক্ষকদের মেসেঞ্জার গ্রুপে পোস্ট করেন এবং সেখান থেকে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, দায়িত্বহীন আচরণ এবং যাচাই না করে তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগে সহকারী শিক্ষক শারমিন জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মিড-ডে মিল কার্যক্রমের তদারকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঠিক ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রিপোর্টার নাম: 






















