ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন এক নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। ইন্টারনেটের পর্দা ও ভার্চুয়াল দুনিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল যুগের ‘জেন-জি’ বা জেনারেশন জেড প্রজন্মের প্রতিনিধিরা এখন সরাসরি রাজপথে নেমে এসেছেন। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের তীব্র আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভে শুধু তরুণরাই নন, বরং তাদের অভিভাবকেরাও সংহতি জানিয়ে রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল দৃশ্যপট তৈরি করেছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে মূলত শিক্ষকতা ও উচ্চশিক্ষা খাতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের জোরালো দাবি জানানো হচ্ছে। গত ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন অভিমুখে লংমার্চ করার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বাধা দেয় এবং লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এতে বহু শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মী আহত হন, যা ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুরুর দিকে এই আন্দোলনকে অনেকেই সীমিত পরিসরের একটি সাধারণ প্রতিবাদ বলে মনে করেছিলেন। তবে পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে অনশনরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনাটি পুরো আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিমে ভর করে এই প্রতিবাদী স্রোত এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। আন্দোলনরত তরুণরা ব্যঙ্গচিত্র, গান, সেলফি এবং অভিনব সব সাজসজ্জার মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। কেউ সুপারহিরো স্পাইডার-ম্যানের পোশাকে আবার কেউ আয়রন ম্যানের মুখোশ পরে স্লোগানমুখর করে তুলেছেন যন্তর মন্তরের চারপাশ।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী শিবমের অভিজ্ঞতা এই প্রজন্মের গভীর হতাশার এক বাস্তব চিত্র। তিনি জানান, তার অনেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পরেও চাকরি না পেয়ে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ব্লিঙ্কিট কিংবা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ র্যাপিডোতে চালকের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিবমের মতে, মা-বাবার উচ্চাশা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই চরম অনিশ্চয়তা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। শিবমের মা ক্ষোভ ও বেদনার্ত হৃদয়ে জানান, তীব্র গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশে কংক্রিটের মেঝেতে তাঁবু টানিয়ে ঘুমাতে বাধ্য হওয়া এসব তরুণদের দুর্দশা দেখে যেকোনো অভিভাবকের বুক ফেটে কান্না আসার কথা।
রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মীরা মনে করছেন, এই গণআন্দোলন ভারতের প্রবীণ ও নীতিপ্রণেতাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদব মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণত প্রবীণ সমাজ মনে করে থাকে বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় বিষয়াবলী নিয়ে উদাসীন এবং কেবল আরাম-আয়েশে ব্যস্ত। কিন্তু যন্তর মন্তরের এই বিশাল জনস্রোত প্রমাণ করেছে যে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে, কেবল তাদের প্রকাশের ভাষা ও ভঙ্গি বোঝার মানসিকতা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর থাকা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য এই যুব অসন্তোষ একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষাব্যবস্থার আস্থার সংকট দূর না হলে এই জেন-জি আন্দোলন আগামী দিনে আরও বড় রূপ নিতে পারে। তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অভিভাবকদের সরব উপস্থিতি ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
রিপোর্টার নাম: 



















