Hi

০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞান ও দর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া জ্যামিতির সেই অদ্ভুত প্রেম

জ্যামিতি শব্দটা শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে কিছু শুষ্ক সূত্র আর জটিল সব চিত্র। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই আপাত নিরস বিষয়টিই যুগে যুগে পৃথিবীর সেরা মস্তিস্কগুলোকে বুঁদ করে রেখেছে। সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস কিংবা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী স্যার আইজ্যাক নিউটন—উভয়েরই জীবন ও চিন্তার জগৎ আমূল বদলে গিয়েছিল ইউক্লিডের জ্যামিতির ছোঁয়ায়। তাঁদের এই জ্যামিতির প্রেমে পড়ার গল্পটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই অনুপ্রেরণাদায়ী।

থমাস হবসের বয়স যখন ৪০ বছর, তখন পর্যন্ত তিনি দর্শনের নানা জটিল তত্ত্ব নিয়ে দিন কাটালেও জ্যামিতির ধার ধারেননি। জীবনীকার জন অব্রির ‘ব্রিফ লাইভস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একদিন এক বন্ধুর লাইব্রেরিতে গিয়ে হবসের চোখ পড়ে টেবিলের ওপর খোলা থাকা ইউক্লিডের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এলিমেন্টস’-এর ওপর। সেখানে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের (৪৭ নম্বর প্রস্তাবনা) জ্যামিতিক চিত্র দেখে হবস প্রথমে চমকে ওঠেন এবং অবিশ্বাস্য মনে করে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু কৌতূহল ও জেদ চেপে বসায় তিনি প্রতিটি প্রমাণের সূত্র ধরে পেছনের উপপাদ্যগুলো পড়তে শুরু করেন। এভাবে একদম শুরুতে থাকা সাধারণ স্বতঃসিদ্ধ নিয়মগুলোতে পৌঁছে ধাপে ধাপে যখন আবার সামনে এগিয়ে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান প্রতিটি যুক্তি ইটের গাঁথুনির মতো নিখুঁত। হবসের এই জাদুকরি রূপান্তর জ্যামিতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে তাঁর দার্শনিক চিন্তার যৌক্তিক কাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

অনুরূপ এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল তরুণ আইজ্যাক নিউটনেরও। ১৬৬১ সালে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময় নিউটন ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ বইটি হাতে নিয়ে প্রথমে ভেবেছিলেন এটি অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ বিষয়। কিন্তু বইটির ভেতরে থাকা চলমান ত্রিভুজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর চোখ কপালে ওঠে। তিনি দেখলেন, ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুকে ভূমির সমান্তরালে যতই সরানো হোক না কেন, তার আকৃতি বদলে গেলেও ক্ষেত্রফল অপরিবর্তিত থাকে। এই অবিসংবাদিত সত্য নিউটনের চিন্তার জগতকে আলোড়িত করে। পরবর্তীতে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহের ঘূর্ণন গতিপথ ও মহাকর্ষ সূত্র প্রমাণ করতে নিউটন জ্যামিতির এই চমৎকার নীতিটিই ব্যবহার করেছিলেন, যা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’-কে সমৃদ্ধ করেছে। জ্যামিতির এই যৌক্তিক সৌন্দর্য কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, বরং মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচনের এক অনন্য চাবিকাঠি।

জনপ্রিয়

বিজ্ঞান ও দর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া জ্যামিতির সেই অদ্ভুত প্রেম

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

বিজ্ঞান ও দর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া জ্যামিতির সেই অদ্ভুত প্রেম

আপডেট : ০৭:৩১:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

জ্যামিতি শব্দটা শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে কিছু শুষ্ক সূত্র আর জটিল সব চিত্র। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই আপাত নিরস বিষয়টিই যুগে যুগে পৃথিবীর সেরা মস্তিস্কগুলোকে বুঁদ করে রেখেছে। সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস কিংবা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী স্যার আইজ্যাক নিউটন—উভয়েরই জীবন ও চিন্তার জগৎ আমূল বদলে গিয়েছিল ইউক্লিডের জ্যামিতির ছোঁয়ায়। তাঁদের এই জ্যামিতির প্রেমে পড়ার গল্পটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই অনুপ্রেরণাদায়ী।

থমাস হবসের বয়স যখন ৪০ বছর, তখন পর্যন্ত তিনি দর্শনের নানা জটিল তত্ত্ব নিয়ে দিন কাটালেও জ্যামিতির ধার ধারেননি। জীবনীকার জন অব্রির ‘ব্রিফ লাইভস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একদিন এক বন্ধুর লাইব্রেরিতে গিয়ে হবসের চোখ পড়ে টেবিলের ওপর খোলা থাকা ইউক্লিডের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এলিমেন্টস’-এর ওপর। সেখানে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের (৪৭ নম্বর প্রস্তাবনা) জ্যামিতিক চিত্র দেখে হবস প্রথমে চমকে ওঠেন এবং অবিশ্বাস্য মনে করে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু কৌতূহল ও জেদ চেপে বসায় তিনি প্রতিটি প্রমাণের সূত্র ধরে পেছনের উপপাদ্যগুলো পড়তে শুরু করেন। এভাবে একদম শুরুতে থাকা সাধারণ স্বতঃসিদ্ধ নিয়মগুলোতে পৌঁছে ধাপে ধাপে যখন আবার সামনে এগিয়ে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান প্রতিটি যুক্তি ইটের গাঁথুনির মতো নিখুঁত। হবসের এই জাদুকরি রূপান্তর জ্যামিতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে তাঁর দার্শনিক চিন্তার যৌক্তিক কাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

অনুরূপ এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল তরুণ আইজ্যাক নিউটনেরও। ১৬৬১ সালে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময় নিউটন ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ বইটি হাতে নিয়ে প্রথমে ভেবেছিলেন এটি অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ বিষয়। কিন্তু বইটির ভেতরে থাকা চলমান ত্রিভুজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর চোখ কপালে ওঠে। তিনি দেখলেন, ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুকে ভূমির সমান্তরালে যতই সরানো হোক না কেন, তার আকৃতি বদলে গেলেও ক্ষেত্রফল অপরিবর্তিত থাকে। এই অবিসংবাদিত সত্য নিউটনের চিন্তার জগতকে আলোড়িত করে। পরবর্তীতে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহের ঘূর্ণন গতিপথ ও মহাকর্ষ সূত্র প্রমাণ করতে নিউটন জ্যামিতির এই চমৎকার নীতিটিই ব্যবহার করেছিলেন, যা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’-কে সমৃদ্ধ করেছে। জ্যামিতির এই যৌক্তিক সৌন্দর্য কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, বরং মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচনের এক অনন্য চাবিকাঠি।