বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত নৌপথগুলোতে সম্প্রতি মাশুল ও শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জারিকৃত এই নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জাহাজ পরিবহন, টার্মিনাল ব্যবহার, পণ্য খালাস এবং জেটি ফি-সহ প্রায় অর্ধশত সেবার খরচ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা বা অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় ছাড়াই একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্প খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কনজারভেন্সি চার্জ বা রক্ষণাবেক্ষণ ফি ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে কার্গো, বাল্কহেড ও ট্যাংকার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি তেল পরিবহনকারী ট্যাংকারের প্রতি টনের ফি ১৪৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে পাইলটেজ ফি, চ্যানেল টোল এবং কুলি চার্জেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, গত তিন বছরে জাহাজ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এমনিতেই ১৫ শতাংশ বেড়েছে। নতুন করে মাশুল বৃদ্ধিতে এই ব্যয় আরও ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে চাপে ফেলবে।
বিশেষ করে সিমেন্ট শিল্পের ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিমেন্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরোটাই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, নতুন এই মাশুল কাঠামোর ফলে তাদের পরিচালন ব্যয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে সিমেন্ট শিল্প এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প মালিকরা ইতিমধ্যে উভয়সংকটে রয়েছেন। একদিকে পণ্যের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, অন্যদিকে দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) পক্ষ থেকেও এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে এই নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে আগের মাশুল হার অপরিবর্তিত থাকায় বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সমন্বয় করা হয়েছে। নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আপত্তি বা আবেদন জানানো হয়, তবে সরকার বিষয়টি পর্যালোচনার সুযোগ রাখবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার যে প্রচেষ্টা চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই বাড়তি খরচ শিল্প খাতের জন্য নতুন কোনো সংকট তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রিপোর্টার নাম: 





















