বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং এক নতুন ও আতঙ্কজনক প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ধূমপান ত্যাগের দোহাই দিয়ে এর ব্যবহার শুরু হলেও বিশেষজ্ঞরা একে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ ‘অদৃশ্য জাল’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। সম্প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে আয়োজিত ১৭৮তম মাদকবিরোধী অনলাইন পরামর্শ সভায় এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এই সভায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল ই-সিগারেটের মারাত্মক কুফল এবং এর মাধ্যমে তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল তার দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, ই-সিগারেট কোনোভাবেই ধূমপান ছাড়ার নিরাপদ বিকল্প নয়। বরং এটি তরুণদের স্নায়বিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। তিনি তার ক্লিনিকে আসা তরুণ রোগীদের উদাহরণ টেনে বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে আসছেন যারা এক সময় অত্যন্ত মেধাবী এবং শান্ত ছিল, কিন্তু ভ্যাপিংয়ের কবলে পড়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। ডা. কামাল একটি করুণ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, এক মা তার সন্তানের চোখের নিচের কালি এবং উদাসীনতা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওই তরুণের চোখেমুখে যেমন পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে, তেমনি তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকেও সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় যে নিকোটিন এবং রাসায়নিক পদার্থ থাকে, তা মস্তিষ্কের সংবেদনশীল কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে অনিদ্রা, অবসাদ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতার মতো সমস্যা প্রকট হয়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ই-সিগারেটের তরল বা লিকুইডের সাথে বিভিন্ন ধরণের শক্তিশালী মাদকদ্রব্য মিশিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারী তরুণরা বুঝতেও পারছে না। এভাবে তারা অলক্ষ্যে কঠোর মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। ডা. মোহিত কামাল তার আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন যে, জুনিয়র সহকর্মী যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন, তারাও প্রতিদিন একই ধরণের রোগীদের সম্মুখীন হচ্ছেন, যা একটি জাতীয় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পারিবারিক সচেতনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, সন্তানদের আচরণে কোনো ধরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংকে কেবল একটি শৌখিন অভ্যাস হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি মাদকের একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষাক্ত নেশার হাত থেকে রক্ষা করতে।
রিপোর্টার নাম: 





















