মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দামেস্ক। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবেলা’য় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। সিরিয়ার শীর্ষ নেতার এই নমনীয় অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিমান ও স্থল অভিযান তীব্রতর করেছে। প্রেসিডেন্ট শারা আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় অর্জিত হতে যাওয়া এই সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তি কেবল দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতা দূরই করবে না, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত শান্তি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের আকস্মিক পতনের পর সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা সাবেক বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল-শারার জন্য এটি একটি অত্যন্ত কৌশলগত কূটনৈতিক পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর বারবার অনুপ্রবেশ এবং সামরিক অভিযানের কারণে দামেস্কের সামনে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। কেবল চলতি মাসেই সীমান্ত পেরিয়ে সিরীয় ভূখণ্ডে দুই ডজনের বেশিবার সামরিক তৎপরতা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক সংঘাত এড়াতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কূটনৈতিক আলোচনার ওপর সর্বাধিক জোর দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
সাক্ষাৎকারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন, লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে দামেস্কের নেই। তবে লেবাননে চলমান অস্থিরতা ও সংকট নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে সিরিয়া। শারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, লেবাননে দীর্ঘায়িত অস্থিতিশীলতা অবধারিতভাবে সিরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। লেবাননের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশটির ভূখণ্ডে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল ধরণের অস্ত্র কেবল রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে ও সেনাবাহিনীর হাতেই থাকা উচিত। যুদ্ধ কিংবা শান্তির মতো অতি সংবেদনশীল জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ারও কেবল বৈধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই থাকা বাঞ্ছনীয়।
এদিকে লেবাননের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ইরাকের সঙ্গেও সিরিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট শারা। আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের বিস্তার রোধ করতে চায় তাঁর সরকার। বর্তমানের এই আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা গোটা অঞ্চলের জন্য একটি বড় ধরনের মানবিক ও ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বহুমুখী সংকটের মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত আঞ্চলিক সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট।
রিপোর্টার নাম: 





















