২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল। তবে এই বিজয়ের ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত পরিবারের বুকফাঁটা আর্তনাদ ও হারানোর বেদনা। ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়ে পুলিশের নৃশংস গুলিবর্ষণে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী সাদাফের পরিবার এখনো সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আজো কাটেনি তাঁর পরিবারের গভীর শোক ও শূন্যতা।
সেদিনের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সাদাফের পরিবার জানায়, ৫ আগস্ট সকালে গণিত খাতা খোলা রেখেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সাদাফ। জ্যামিতির একটি ত্রিভুজ অর্ধেক আঁকা অবস্থায় খাতায় পেনসিলটি গোঁজা ছিল। টিউশনি বা প্রাইভেটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় মা সাদিয়া আক্তারকে সে বলেছিল দুপুরের আগেই ফিরে আসবে। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। আশুলিয়ার জামগড়া, ইউনিক ও শিমুলতলা এলাকায় দুপুরের পর থেকেই মানুষের ঢল নামে। একদিকে বিজয়ের স্লোগান, অন্যদিকে আশুলিয়া থানার মোড়ে থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে বাবা আলতাফ হোসেনের সঙ্গে সাদাফের শেষবারের মতো ফোনে কথা হয়। ফোনে ভেসে আসছিল মানুষের চিৎকার, হর্ন এবং মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। সাদাফ আতঙ্কিত কণ্ঠে তাঁর বাবাকে জানায়, আশুলিয়ায় তখন তীব্র গুলিবর্ষণ হচ্ছে এবং তাঁর চোখের সামনেই কয়েকজন মানুষের মাথায় ও পেটে গুলি লেগেছে। বাবা আলতাফ হোসেন তাঁকে দ্রুত বাড়ি ফেরার আকুতি জানালেও সব রাস্তা বন্ধ থাকায় সাদাফ ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওপাশ থেকে আসা ‘আচ্ছা’ শব্দটিই ছিল বাবার কানে তাঁর ছেলের শেষ কণ্ঠস্বর।
সন্ধ্যা নাগাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা রিকশা ভ্যানে মানুষের লাশের স্তূপ করে রাখছে এবং পরে সেই লাশের স্তূপে পেট্রল ঢেলে নির্মমভাবে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সেই বীভৎস লাশের স্তূপের নিচে ঝুলে থাকা পা এবং পোশাক দেখেই আলতাফ হোসেন শনাক্ত করেন তাঁর ছেলে সাদাফকে। নীল জিন্স ও আকাশী নীল রঙের শার্টটি পোড়ার পর সাদাফের পুরো শরীর কয়লা হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষেরা ছয়টি লাশ পলিথিনে মুড়িয়ে জানাজা দিয়ে দাফন করেন।
আজ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়েও সেই ঘটনার ক্ষত এতটুকু কমেনি সাদাফের পরিবারের। তাঁর পড়ার টেবিল এবং জ্যামিতির খাতাটি আজো ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। মা সাদিয়া আক্তার এখনো রাতে ঘুমাতে পারেন না, চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছেলের পুড়তে থাকা দেহ এবং পুলিশের নির্মমতা। আর বাবা আলতাফ হোসেন প্রতিদিন ছেলের শেষ কল করা মোবাইল ফোনটি আলমারি থেকে বের করে চার্জ দেন এবং শূন্য স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেন। বিজয়ের এ ইতিহাস এই পরিবারের জন্য চিরদিনের এক নীরব হাহাকার হয়ে রয়ে গেল।
রিপোর্টার নাম: 























