Hi

০৪:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইসিটি শিক্ষা ও ডিজিটাল ব্যবধান: প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের তুলনামূলক ভালো কভারেজ থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহার, স্মার্টফোনের বিস্তার এবং ডিজিটাল সেবার কার্যকর ব্যবহারে দেশটি এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে। গত এক দশকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়েছে, তবে এখন সেই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা এবং উন্নত ডিজিটাল নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারে, সেজন্য ডিজিটাল বৈষম্য কমানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এই বিবেচনায় আজ থেকে প্রায় তেরো বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে এর বাস্তবায়নে যথাযথ প্রস্তুতি ছিল অসম্পূর্ণ। দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা বা পদার্থবিজ্ঞানের মতো অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি ক্লাস নিচ্ছেন। অথচ আইসিটি এমন একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়, যার জ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তবতার একটি স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতাও এখানে লক্ষণীয়। আইসিটি মূলত একটি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বিষয় হলেও আমাদের পাঠ্যক্রমে এখনো মুখস্থনির্ভরতার প্রভাব অনেক বেশি, যা প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার মতো ক্ষেত্রে হাতে-কলমে শেখার সুযোগকে সীমিত করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা, কম্পিউটার ল্যাবের বিদ্যমানতা বা অনুপস্থিতির মতো বাস্তবিক বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এর ফলস্বরূপ, অনেক শিক্ষার্থী কলেজ পর্যায়ে যে মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করার কথা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের সেগুলো নতুন করে শিখতে হচ্ছে। শুধু কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন বা ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই আইসিটি শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না, বরং সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইসিটি শিক্ষাকে কেবল বোর্ডে লিখে শেখানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলন।

দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করে না, অথচ সরকারি সেবার একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে অনলাইননির্ভর হয়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্রের ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুফল জনগণের একটি বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অন্যদিকে, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন বা অন্যান্য ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগও স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সুবিধার সহজলভ্যতার ওপর নির্ভরশীল। তবে মোবাইল ডেটার মূল্য, সেবার মান এবং অপারেটরদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ এখনও বিদ্যমান, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

একইসাথে, ডিজিটাল সংযোগের বিস্তার নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং ‘ডিপফেক’-এর বিস্তার ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত জনবল ও বিশেষায়িত দক্ষতার ঘাটতি প্রকট। এছাড়াও, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের ঘটনা নিয়মিত গণমাধ্যমে উঠে আসছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

এসব সমস্যার কোনো একক সমাধান নেই বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষক নিয়োগ ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কলেজ পর্যায়ে ল্যাবভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, আধুনিক শিক্ষণ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা—এই চারটি বিষয়কে যদি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া না যায়, তবে ডিজিটাল উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল কখনোই সমাজের সবার কাছে পৌঁছাবে না।

জনপ্রিয়

শিখা অনির্বাণে নতুন নৌপ্রধানের শ্রদ্ধা: সমুদ্রসীমার রক্ষায় আধুনিক ব্লু ওয়াটার নেভি গড়ার দৃপ্ত অঙ্গীকার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

আইসিটি শিক্ষা ও ডিজিটাল ব্যবধান: প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

আপডেট : ০২:৩৭:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের তুলনামূলক ভালো কভারেজ থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহার, স্মার্টফোনের বিস্তার এবং ডিজিটাল সেবার কার্যকর ব্যবহারে দেশটি এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে। গত এক দশকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়েছে, তবে এখন সেই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা এবং উন্নত ডিজিটাল নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারে, সেজন্য ডিজিটাল বৈষম্য কমানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এই বিবেচনায় আজ থেকে প্রায় তেরো বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে এর বাস্তবায়নে যথাযথ প্রস্তুতি ছিল অসম্পূর্ণ। দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা বা পদার্থবিজ্ঞানের মতো অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি ক্লাস নিচ্ছেন। অথচ আইসিটি এমন একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়, যার জ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তবতার একটি স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতাও এখানে লক্ষণীয়। আইসিটি মূলত একটি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বিষয় হলেও আমাদের পাঠ্যক্রমে এখনো মুখস্থনির্ভরতার প্রভাব অনেক বেশি, যা প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার মতো ক্ষেত্রে হাতে-কলমে শেখার সুযোগকে সীমিত করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা, কম্পিউটার ল্যাবের বিদ্যমানতা বা অনুপস্থিতির মতো বাস্তবিক বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এর ফলস্বরূপ, অনেক শিক্ষার্থী কলেজ পর্যায়ে যে মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করার কথা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের সেগুলো নতুন করে শিখতে হচ্ছে। শুধু কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন বা ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই আইসিটি শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না, বরং সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইসিটি শিক্ষাকে কেবল বোর্ডে লিখে শেখানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলন।

দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করে না, অথচ সরকারি সেবার একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে অনলাইননির্ভর হয়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্রের ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুফল জনগণের একটি বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অন্যদিকে, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন বা অন্যান্য ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগও স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সুবিধার সহজলভ্যতার ওপর নির্ভরশীল। তবে মোবাইল ডেটার মূল্য, সেবার মান এবং অপারেটরদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ এখনও বিদ্যমান, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

একইসাথে, ডিজিটাল সংযোগের বিস্তার নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং ‘ডিপফেক’-এর বিস্তার ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত জনবল ও বিশেষায়িত দক্ষতার ঘাটতি প্রকট। এছাড়াও, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের ঘটনা নিয়মিত গণমাধ্যমে উঠে আসছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

এসব সমস্যার কোনো একক সমাধান নেই বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষক নিয়োগ ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কলেজ পর্যায়ে ল্যাবভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, আধুনিক শিক্ষণ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা—এই চারটি বিষয়কে যদি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া না যায়, তবে ডিজিটাল উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল কখনোই সমাজের সবার কাছে পৌঁছাবে না।