একসময় বাঙালির পারিবারিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল টিনের তৈরি ট্রাংক। ঘরের কোণে সযত্নে রাখা এই ট্রাংক যেন কেবল একটি আসবাবপত্র ছিল না, বরং তা ছিল পরিবারের মূল্যবান দলিল, পুরোনো ছবি, গয়না এবং স্মৃতির এক বিশ্বস্ত আধার। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে—যেমন বিয়ে, উচ্চশিক্ষা বা নতুন কর্মস্থলে যাত্রার সময় ট্রাংকই ছিল একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আধুনিক স্টিলের আলমারি, টেকসই ট্রলি ব্যাগ এবং প্লাস্টিকের সুসজ্জিত স্টোরেজ বক্সের ভিড়ে এই টিনের ট্রাংক আজ এক প্রান্তিক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি বিলুপ্তির পথে থাকলেও, সিলেটের ঝালোপাড়া এলাকায় এখনো কিছু কারখানায় এর অস্তিত্ব টিকে আছে। হাতেগোনা কয়েকটি কারখানায় কারিগররা পরম মমতায় তৈরি করে চলেছেন এসব ট্রাংক। আকার ও গুণমান ভেদে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে এসব বিক্রি হয়। তবে ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, চাহিদার ব্যাপক ঘাটতির কারণে এই পেশায় এখন আর আগের মতো স্বচ্ছলতা নেই। একজন কারিগর সারাদিনে গড়ে ৮ থেকে ৯টি ট্রাংক তৈরি করতে পারেন, যার বিনিময়ে তাদের মজুরি মেলে ৯০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য এই কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির তুলনায় কায়িক শ্রমের ভূমিকাই বেশি।
দীর্ঘ চার দশক ধরে এই শিল্পের সাথে জড়িত আবদুল মান্নান এবং ২৯ বছর ধরে কর্মরত বাদশা মিয়ার মতো দক্ষ কারিগররা এখনো এই কারুশিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন। টিনের ব্ল্যাকশিট নিখুঁতভাবে মেপে কাটা, ট্রাংকের দুই পাশে লোহার হাতল সংযোজন, টেকসই ছিটকিনি লাগানো এবং নকশা খোদাইয়ের প্রতিটি ধাপই তাদের কাছে এক একটি শিল্পের মতো। তবুও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় কারিগরদের জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা ভর করেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে এই পেশায় আসতে অনাগ্রহী, ফলে দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে কমছে।
আধুনিকতার চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের কদর কমলেও, এখনো গ্রামবাংলায় বা বিভিন্ন দাপ্তরিক নথিপত্র সংরক্ষণে টিনের ট্রাংকের বিশেষ উপযোগিতা অনস্বীকার্য। অনেকে শখ করে বা পুরোনো স্মৃতি ধরে রাখার প্রয়োজনেও এটি ব্যবহার করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং এই শিল্পের সৃজনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সিলেটের এই কারিগরদের লড়াই যেন কেবল জীবিকা নির্বাহের যুদ্ধ নয়, এটি একটি ঐতিহ্যের অবশিষ্টাংশকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রাম। টিনের ট্রাংক তৈরির এই শৈল্পিক কর্মধারা যদি হারিয়ে যায়, তবে বাঙালি সংস্কৃতির একটি অধ্যায় চিরতরে ম্লান হয়ে যাবে।
রিপোর্টার নাম: 






















