Hi

১০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপট

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অত্যন্ত উত্তাল ও ঘটনাবহুল সময়। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছিল না।

এর আগে ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর জাতীয় জীবনে গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পর্যুদস্ত অর্থনীতি, জীবনমান হ্রাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাকশালী শাসনের কালো থাবা, জনগণের নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি জনগণকে বিষিয়ে তুলেছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যেখানে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয় এবং খালেদ মোশাররফ নিজে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই অস্থিরতার সুযোগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। এমনকি ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করার বিষয়েও দোটানায় ছিলেন।

তৎকালীন রাজনীতিতে অস্থিরতার পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক কারণ ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অর্থনীতিতে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দেয়। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ে দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হওয়ায় বিদেশি বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless Basket) বলে উপহাস করেছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটেই সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর ভেতরেও তখন প্রচণ্ড অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ১৯৭৪ সালে জাসদের হাত ধরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামক একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল, যা সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলার পরিবর্তে তথাকথিত ‘শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লবের’ আদর্শ ছড়িয়ে দেয়। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি চেয়েছিল সেনাবাহিনীতে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থাকবে না এবং তারা ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আদল ভেঙে একটি গণবাহিনীতে পরিণত হবে। তাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ব্রিটিশ অথবা পাকিস্তানি সেনাদের মতো হবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তারা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। একদিকে জেলহত্যা, অপরদিকে ক্যু-পাল্টাক্যু, সেনাকর্মকর্তা হত্যাসহ জাসদের গণবাহিনীর হঠকারী তৎপরতা মিলে এক নারকীয় অস্থিরতায় পূর্ণ ছিল দেশ। বিশেষত তাহের ও সিরাজুল আলম খান সেনাবাহিনীতে রাতারাতি যে সাম্যবাদ চালু করতে চান, তা সাধারণ সেনাদের মধ্যে ‘স্বর্গপ্রাপ্তি’ ধরনের অনুকূল সাড়া জাগিয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল সেনাবাহিনীতে তাহেরের অনুগত মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান প্রত্যাগত বহু সদস্য থাকায়। তারা তাহেরের প্রতি ‘স্বপ্নপূরণের দ্রষ্টা’ হিসেবে মনে করে বিশ্বাস করেছিল। মধু এবং দুধের নহর বয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন তাহের তাদের। তারা সর্বোচ্চ পদ চেয়েছিলেন সুবেদার।

২ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর জাসদ ও তাদের সামরিক শাখা সিপাহিদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। তারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত পোস্টার বিলি করে। এসব দাবির মধ্যে ছিল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বেতন বৃদ্ধি, আবাসন ও খাবারের উন্নয়ন এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি ছিল ‘ব্যাটম্যান প্রথা’ বিলুপ্তি। এর পাশাপাশি ডানপন্থী দলগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং খালেদ মোশাররফকে ভারতের দালাল হিসেবে চিত্রিত করে প্রচারাভিযান চালায়। এই মিশ্র প্রচারণা সেনাসদস্যদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। যেমন— ‘যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এমন রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। বেতন বাড়াতে হবে, থাকা ও খাওয়ার উন্নতি করতে হবে’ ইত্যাদি। ডান চরমপন্থীদের এই পোস্টারে সৈনিকদের দাবি-দাওয়া ছাড়াও খালেদ মোশাররফ যে ভারতের দালাল, তা খুব জোরেশোরে বলা হয়।

৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সিপাহিরা অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে অস্ত্রহাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। ৭ নভেম্বর ভোরে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি সিপাহি ও জনতার বিপুল সমর্থনে রাজনীতির মূল মঞ্চে আবির্ভূত হন। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তাই এই সিপাহিরা স্লোগান তুলেছিল— ‘সেপাই সেপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সাধারণ সেনারা অফিসারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান। শেষাংশে জিয়াউর রহমান সৈনিকদের কাঁধে চড়ে পাশার দান উল্টে দেন। সৈনিকেরা তাকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে উদ্ধার করে কাঁধে চাপিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগিয়ে দেন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের তৎকালীন রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। সাংবিধানিক কাঠামোতে পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেন এবং সংবিধানের ৮(১) ও ৮(১ক) অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনেন। এছাড়া ৮(১) অনুচ্ছেদে সমাজতন্ত্রকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অর্থে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামক একটি নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে এই ধারণায় দেশীয় ভূখণ্ডের সব জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। সংবিধানের ২৫(২) অনুচ্ছেদে ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক জোরদার করার ধারাটিও যুক্ত হয়। এই ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কালে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বিকাশ লাভ করে।

৭ নভেম্বরের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত। বিএনপি ও এর অনুসারীরা এটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। জাসদের দৃষ্টিতে এটি ছিল সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, আবার আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন মহলে এটি ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। এই পটপরিবর্তনের ফলে দেশে দীর্ঘস্থায়ী একদলীয় শাসনব্যবস্থার বদলে বহুদলীয় রাজনীতির চর্চা শুরু হয় এবং অর্থনৈতিক নীতি সমাজতান্ত্রিক ধারা থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কর্নেল তাহের ও খালেদ মোশাররফের একটি সংযোগ পাওয়া যায়। নানা সুবিধামহল, বিশেষত স্বাধীনতাবিরোধীরা মাঠে নামার সুযোগটিকে কার্যকর করে। এর সঙ্গে জনগণেরও সমর্থন জুটে যায় জিয়ার ভাগ্যে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপট

আপডেট : ১০:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অত্যন্ত উত্তাল ও ঘটনাবহুল সময়। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছিল না।

এর আগে ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর জাতীয় জীবনে গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পর্যুদস্ত অর্থনীতি, জীবনমান হ্রাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাকশালী শাসনের কালো থাবা, জনগণের নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি জনগণকে বিষিয়ে তুলেছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যেখানে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয় এবং খালেদ মোশাররফ নিজে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই অস্থিরতার সুযোগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। এমনকি ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করার বিষয়েও দোটানায় ছিলেন।

তৎকালীন রাজনীতিতে অস্থিরতার পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক কারণ ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অর্থনীতিতে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দেয়। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ে দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হওয়ায় বিদেশি বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless Basket) বলে উপহাস করেছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটেই সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর ভেতরেও তখন প্রচণ্ড অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ১৯৭৪ সালে জাসদের হাত ধরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামক একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল, যা সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলার পরিবর্তে তথাকথিত ‘শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লবের’ আদর্শ ছড়িয়ে দেয়। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি চেয়েছিল সেনাবাহিনীতে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থাকবে না এবং তারা ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আদল ভেঙে একটি গণবাহিনীতে পরিণত হবে। তাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ব্রিটিশ অথবা পাকিস্তানি সেনাদের মতো হবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তারা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। একদিকে জেলহত্যা, অপরদিকে ক্যু-পাল্টাক্যু, সেনাকর্মকর্তা হত্যাসহ জাসদের গণবাহিনীর হঠকারী তৎপরতা মিলে এক নারকীয় অস্থিরতায় পূর্ণ ছিল দেশ। বিশেষত তাহের ও সিরাজুল আলম খান সেনাবাহিনীতে রাতারাতি যে সাম্যবাদ চালু করতে চান, তা সাধারণ সেনাদের মধ্যে ‘স্বর্গপ্রাপ্তি’ ধরনের অনুকূল সাড়া জাগিয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল সেনাবাহিনীতে তাহেরের অনুগত মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান প্রত্যাগত বহু সদস্য থাকায়। তারা তাহেরের প্রতি ‘স্বপ্নপূরণের দ্রষ্টা’ হিসেবে মনে করে বিশ্বাস করেছিল। মধু এবং দুধের নহর বয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন তাহের তাদের। তারা সর্বোচ্চ পদ চেয়েছিলেন সুবেদার।

২ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর জাসদ ও তাদের সামরিক শাখা সিপাহিদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। তারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত পোস্টার বিলি করে। এসব দাবির মধ্যে ছিল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বেতন বৃদ্ধি, আবাসন ও খাবারের উন্নয়ন এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি ছিল ‘ব্যাটম্যান প্রথা’ বিলুপ্তি। এর পাশাপাশি ডানপন্থী দলগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং খালেদ মোশাররফকে ভারতের দালাল হিসেবে চিত্রিত করে প্রচারাভিযান চালায়। এই মিশ্র প্রচারণা সেনাসদস্যদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। যেমন— ‘যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এমন রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। বেতন বাড়াতে হবে, থাকা ও খাওয়ার উন্নতি করতে হবে’ ইত্যাদি। ডান চরমপন্থীদের এই পোস্টারে সৈনিকদের দাবি-দাওয়া ছাড়াও খালেদ মোশাররফ যে ভারতের দালাল, তা খুব জোরেশোরে বলা হয়।

৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সিপাহিরা অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে অস্ত্রহাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। ৭ নভেম্বর ভোরে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি সিপাহি ও জনতার বিপুল সমর্থনে রাজনীতির মূল মঞ্চে আবির্ভূত হন। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তাই এই সিপাহিরা স্লোগান তুলেছিল— ‘সেপাই সেপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সাধারণ সেনারা অফিসারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান। শেষাংশে জিয়াউর রহমান সৈনিকদের কাঁধে চড়ে পাশার দান উল্টে দেন। সৈনিকেরা তাকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে উদ্ধার করে কাঁধে চাপিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগিয়ে দেন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের তৎকালীন রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। সাংবিধানিক কাঠামোতে পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেন এবং সংবিধানের ৮(১) ও ৮(১ক) অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনেন। এছাড়া ৮(১) অনুচ্ছেদে সমাজতন্ত্রকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অর্থে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামক একটি নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে এই ধারণায় দেশীয় ভূখণ্ডের সব জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। সংবিধানের ২৫(২) অনুচ্ছেদে ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক জোরদার করার ধারাটিও যুক্ত হয়। এই ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কালে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বিকাশ লাভ করে।

৭ নভেম্বরের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত। বিএনপি ও এর অনুসারীরা এটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। জাসদের দৃষ্টিতে এটি ছিল সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, আবার আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন মহলে এটি ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। এই পটপরিবর্তনের ফলে দেশে দীর্ঘস্থায়ী একদলীয় শাসনব্যবস্থার বদলে বহুদলীয় রাজনীতির চর্চা শুরু হয় এবং অর্থনৈতিক নীতি সমাজতান্ত্রিক ধারা থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কর্নেল তাহের ও খালেদ মোশাররফের একটি সংযোগ পাওয়া যায়। নানা সুবিধামহল, বিশেষত স্বাধীনতাবিরোধীরা মাঠে নামার সুযোগটিকে কার্যকর করে। এর সঙ্গে জনগণেরও সমর্থন জুটে যায় জিয়ার ভাগ্যে।