আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতে নিয়েছেন ৮৫ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই। গতকাল শুক্রবার নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণার সময় তিনি জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। প্রথম দিকে বিষয়টি কৌতুক বলে মনে হলেও পরে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই সম্মাননা আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার সব ভুক্তভোগী এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিদের উৎসর্গ করেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর অভিনন্দন ও শুভেচ্ছায় ভাসছেন পিল্লাই। তাই তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো সবাইকে তিনি বলছিলেন, ‘এটি নিশ্চয়ই একটি কৌতুক!…আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক মূল্যবান। পরে কৌতুক করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি তালি দেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস এক সংবাদ সম্মেলনে পিল্লাইয়ের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে নাভি পিল্লাইয়ের অবদান অসামান্য। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ফ্রিডনেস। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধা বর্তমানে ক্ষমতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের।
নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে পিল্লাইয়ের দীর্ঘদিনের বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা ও সাহসের বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক নাভি পিল্লাইয়ের এই জয়কে মানবাধিকারের জন্য একটি ‘সমষ্টিগত বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডও এই প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
তবে নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরস্কারের কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছে যে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাভি পিল্লাই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছিল। তবে ইসরায়েলের অভিযোগ নাকচ করে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে যে, তারা গাজার ঘটনাবলী নিয়ে কোনো পক্ষ নিচ্ছে না; বরং পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের পেশাদারি ও সততার ভিত্তিতেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছে ইসরায়েল।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে নাভি পিল্লাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বাসচালক। কর্মজীবনের শুরুতে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইরত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি সহায়তা দিয়ে তিনি পরিচিতি পান। ১৯৬৭ সালে ডারবানে তিনি প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নজির স্থাপন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং ১৯৮৮ সালে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
নাভি পিল্লাইয়ের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন দীর্ঘ এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। চার বছর পর, তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) বিচারক ও সভাপতি হন। সেখানে থাকাকালীন তিনি যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও ঘৃণা ছড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার আওতায় বিচার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি তৈরি করেন। তবে একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে আমি বিষয়টি যাচাই করে নিতে চাই। আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার অপচেষ্টার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের আবারও এমন এক বিশ্বের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যেখানে কার কষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা আইনের বদলে ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হয়। তিনি জানান, বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা ও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা অবিচল থেকেছেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) হিসেবে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
রিপোর্টার নাম: 























