প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশা করছে টোকিও। আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সেখানে সরকারি সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। গত ২০ অক্টোবর দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথভাবে এ সফরের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়। সফরকালে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক আস্থা জোরদার এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, সফরটি বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর জন্য শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
টোকিওতে অনুষ্ঠিতব্য এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এই টোকিও সফরকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ। সফরটির মাধ্যমে ২০২৩ সালে সূচিত দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব এক নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে বলে দূতাবাস আশা প্রকাশ করছে।
জাপান সরকারের মতে, নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে। এ সফরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও যৌথ সমৃদ্ধি জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সফলভাবে বাস্তবায়ন এবং জাপানি বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতে পারে। দেশটির মতে, আলোচনায় অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
চার দিনের এই সরকারি সফরসূচিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি যুক্ত থাকছে। সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য প্রদান করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। পাশাপাশি তিনি জাপানের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও শিল্পপতিদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের তালিকায় রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং যৌথ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কমিটির প্রতিনিধিরা।
সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও অর্থলগ্নি সংস্থার শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করবেন। এ ছাড়া তিনি চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু এলাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রসিদ্ধ পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটা গাড়ির কারখানা পরিদর্শন করবেন।
বৈদেশিক সম্পর্ক ও উন্নয়ন খাত তরান্বিত করতে এ সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতার প্রস্তুতি চলছে। পররাষ্ট্রসচিব জানান, কৃষি, মৎস্য সম্পদ, মানবসম্পদ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, নাগরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ, বাণিজ্যিক আদান-প্রদান ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মতো বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জোর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জাপানি সহায়তার বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ, স্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও রোহিঙ্গা সংকটের সুনির্দিষ্ট সমাধান বাস্তবায়নেও যৌথ বার্তা দিতে পারে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশ। জাপান দূতাবাস গুরুত্ব প্রদান করেছে যে, উচ্চপর্যায়ের সংলাপ শেষে সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়নই ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারে স্থায়ী ভূমিকা রাখবে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হলে নতুন জাপানি উদ্যোগ বাংলাদেশে আসার পথ উন্মুক্ত হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই বন্ধুপ্রতীম জাপান দেশটির অন্যতম বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার। মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে টোকিওর ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট। ঢাকায় চালু হওয়া মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং মাতারবাড়ীতে সুপরিকল্পিত গভীর সমুদ্র বন্দর ও হাব গঠন জাপানি সহায়তার অনবদ্য স্মারক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত ভিত্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সংহত করবে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, মানবসম্পদ খাতের উন্নয়নসহ অভিন্ন সুবিধার ক্ষেত্রগুলোতে নতুন গতি আনতে এ উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে বলে দুই দেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
রিপোর্টার নাম: 
























