পিরোজপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে তদন্তে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্তত আটটিতে ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। প্রকল্পগুলোর মোট চুক্তিমূল্য ছিল ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা, যার বিপরীতে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২ হাজার ৬৯ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এই অঙ্ক প্রকৃত কাজের ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা বেশি। এক পরিবারের ৮ প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ১২০০ কোটি টাকা ‘লুটপাট’। রিয়াদ বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ, অনেকে আহত। ‘তেলাপোকা’ ঠেকাতে দিল্লি হলো ‘লালকিল্লা’, ভারত হলো ‘কাশ্মীর’। ধানখেতে মরদেহ / স্কুলশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি অটোরিকশাচালকের। দিল্লিতে বিক্ষোভ: ‘কাল আমরা আবার আসবো’। তারপরও ১৫ কোটি ৯২ লাখ টাকার কার্যাদেশের বিপরীতে এরই মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ ১৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা পেয়ে গেছেন ঠিকাদার। জনগণের করের টাকা লুটপাটের এটি একটি ছোট্ট উদাহরণ মাত্র।
দুর্নীতির নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র
- অভিযুক্ত পরিবার: পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজের পরিবার।
- জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহ: মহিউদ্দীন মহারাজ ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
- অন্যান্য সংশ্লিষ্টতা: স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে।
- অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন: সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজ, মিরাজুল ইসলাম এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদারদের অগ্রিম অর্থ প্রদান, একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল তৈরি এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভান্ডারিয়া উপজেলায় ১০ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণের কাজ তিন বছর আগে কার্যাদেশ পেলেও তা আজও শুরু হয়নি। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী, এই প্রকল্পের জন্য চুক্তিমূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ ইতোমধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পে অনিয়ম ও অডিট আপত্তি
- অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ: একটি প্রকল্পে ৯৩৬ কোটি টাকার বিপরীতে ৯৯৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
- নথি গায়েব: হিসাব শাখায় অন্তত ৩৪০টি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
- অডিট আপত্তি: ২০২৫ সালে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ১৭টি প্রকল্পে ২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উত্থাপন করেছে।
- অনিয়মের ধরন: বিল-ভাউচারে অসংগতি, একাধিক প্রকল্পের আওতায় একই কাজের বিল দাখিল এবং সংযোগ সড়ক ছাড়াই সেতু নির্মাণের ঘটনা ঘটেছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর এবং স্থানীয় হিসাব রক্ষণ কার্যালয়ের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ সম্ভব ছিল না। অনেক ফাইলে শুধু হিসাবরক্ষক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর পাওয়া গেছে, যা প্রথাগত সরকারি ক্রয়বিধির পরিপন্থী।
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া
- তদন্তের ফলাফল: দুর্নীতি দমন কমিশন ও এলজিইডির পৃথক তদন্তে আর্থিক অনিয়মের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
- ঠিকাদারের বক্তব্য: মিরাজুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, কাজের প্রয়োজনে কিছু অগ্রিম অর্থ নেওয়া হয়েছিল এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
- ভবিষ্যৎ কার্যক্রম: বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিতর্কিত আটটি প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা এখনো আসেনি।
- আইনি জটিলতা: এলজিইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণে গাফিলতির কারণে প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
উল্লেখ্য যে, এই দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পিরোজপুরের উন্নয়ন প্রকল্পের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এলজিইডির সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, এই লুটপাট শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতি করেনি, বরং তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 
























