Hi

০৬:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নামাজ নিয়ে ভুল মন্তব্যে বিড়ম্বনায় বাগেরহাটের প্রধান শিক্ষক

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বর্তমানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। স্কুলে ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানের বক্তৃতাকালে মুসলিম শিক্ষার্থীদের নামাজে উৎসাহিত করতে গিয়ে তিনি একটি মন্তব্য করেন, যা নিয়ে এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নিজের বক্তব্যের একটি অংশ খণ্ডিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি বেশ বিপাকে পড়েছেন। তার এই উদ্যোগকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্বাগত জানালেও, বক্তব্য বিকৃত করে একাংশ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আসল ভিডিয়োতে নামাজ, ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে তিনি আবেগী বক্তব্য দেন। কিন্তু এত দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ড ভাইরাল করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত স্কুলের ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান থেকে। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় ওই অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.) ও ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এ সময় ছাত্রীদের নিয়মিত নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে। তবে তিনি পরে জানিয়েছেন, কথা বলার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে গিয়েছিল, যা মূলত তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।

প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধাচারণকারী একটি পক্ষ পুরো ভিডিওটি প্রকাশ না করে মাত্র ৬ সেকেন্ডের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে কাটছাঁট করেছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে তিনি নিজের পুরো বক্তৃতার ভিডিওটি প্রকাশ্যে এনেছেন এবং প্রকৃত সত্য জেনে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার উদ্দেশ্য কখনোই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করে সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার পর, এভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোয় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি বড় পরিসরে আয়োজন করতে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছেন, সেটিও বক্তব্যে তুলে ধরেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, প্রধান শিক্ষক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীদের জন্য নামাজের কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ নিজ উদ্যোগে কিনে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, পুরো বক্তব্য না শুনে ভিডিওটি প্রচার করা দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরাও মনে করছে, বক্তব্যটি খণ্ডিতভাবে প্রচারের ফলে শিক্ষকের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে।

নবম শ্রেণির ছাত্রী তাবাসসুম ও অপর এক ছাত্রী আয়েশা তাহাসিন পুথি জানায়, স্যার সব সময় তাদের নামাজ পড়ার জন্য উৎসাহ দেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে স্যারের কথা অসম্পূর্ণভাবে এসেছে, যা প্রকৃত বার্তার বিপরীত। শিক্ষার্থীরা ঘটনার সঠিক তদন্ত ও সত্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ে তিনি জানান, কমিটি ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় ঈদে মিলাদুন্নবী আয়োজনে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে স্কুলের পুরোনো খাতা বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও সভাপতির ব্যক্তিগত অনুদানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি আবারও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মানসিকতা তাঁর নেই।

ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। প্রধান শিক্ষক নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করে সংবাদ প্রচার না করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়েছেন। ইউএনও জানান, তিনি পুরো ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বলেই মনে হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিদ্যালয় চত্বরে রোববার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি সারা দেশে এলপিজি বিক্রির সমস্যা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো জাতীয় বিষয়গুলোও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে।

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

নামাজ নিয়ে ভুল মন্তব্যে বিড়ম্বনায় বাগেরহাটের প্রধান শিক্ষক

আপডেট : ০৪:০৩:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বর্তমানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। স্কুলে ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানের বক্তৃতাকালে মুসলিম শিক্ষার্থীদের নামাজে উৎসাহিত করতে গিয়ে তিনি একটি মন্তব্য করেন, যা নিয়ে এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নিজের বক্তব্যের একটি অংশ খণ্ডিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি বেশ বিপাকে পড়েছেন। তার এই উদ্যোগকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্বাগত জানালেও, বক্তব্য বিকৃত করে একাংশ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আসল ভিডিয়োতে নামাজ, ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে তিনি আবেগী বক্তব্য দেন। কিন্তু এত দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ড ভাইরাল করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত স্কুলের ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান থেকে। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় ওই অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.) ও ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এ সময় ছাত্রীদের নিয়মিত নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে। তবে তিনি পরে জানিয়েছেন, কথা বলার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে গিয়েছিল, যা মূলত তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।

প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধাচারণকারী একটি পক্ষ পুরো ভিডিওটি প্রকাশ না করে মাত্র ৬ সেকেন্ডের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে কাটছাঁট করেছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে তিনি নিজের পুরো বক্তৃতার ভিডিওটি প্রকাশ্যে এনেছেন এবং প্রকৃত সত্য জেনে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার উদ্দেশ্য কখনোই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করে সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার পর, এভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোয় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি বড় পরিসরে আয়োজন করতে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছেন, সেটিও বক্তব্যে তুলে ধরেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, প্রধান শিক্ষক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীদের জন্য নামাজের কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ নিজ উদ্যোগে কিনে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, পুরো বক্তব্য না শুনে ভিডিওটি প্রচার করা দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরাও মনে করছে, বক্তব্যটি খণ্ডিতভাবে প্রচারের ফলে শিক্ষকের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে।

নবম শ্রেণির ছাত্রী তাবাসসুম ও অপর এক ছাত্রী আয়েশা তাহাসিন পুথি জানায়, স্যার সব সময় তাদের নামাজ পড়ার জন্য উৎসাহ দেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে স্যারের কথা অসম্পূর্ণভাবে এসেছে, যা প্রকৃত বার্তার বিপরীত। শিক্ষার্থীরা ঘটনার সঠিক তদন্ত ও সত্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ে তিনি জানান, কমিটি ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় ঈদে মিলাদুন্নবী আয়োজনে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে স্কুলের পুরোনো খাতা বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও সভাপতির ব্যক্তিগত অনুদানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি আবারও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মানসিকতা তাঁর নেই।

ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। প্রধান শিক্ষক নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করে সংবাদ প্রচার না করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়েছেন। ইউএনও জানান, তিনি পুরো ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বলেই মনে হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিদ্যালয় চত্বরে রোববার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি সারা দেশে এলপিজি বিক্রির সমস্যা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো জাতীয় বিষয়গুলোও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে।