যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত শতকোটিপতিদের নিট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপের একটি প্রস্তাব নিয়ে রাজ্যজুড়ে জোর আলোচনা চলছে। রাজ্যের শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আসা এই প্রস্তাবটি আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোটের জন্য উত্থাপন করা হবে। প্রস্তাবটি পাস হলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত যেসব ব্যক্তির নিট সম্পদের পরিমাণ অন্তত ১০০ কোটি ডলার ছিল, তাঁদের ওপর এই বিশেষ কর কার্যকর হবে। এর ফলে অঙ্গরাজ্যটির অন্তত ২০০ জন শীর্ষ ধনী সরাসরি এই করের আওতাভুক্ত হবেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির ২০০ জনের বেশি শতকোটিপতি এ করের আওতায় আসবেন। ডন হ্যাংকি বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে প্রস্তাবটি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলো। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তাঁর করের দায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সব শতকোটিপতি অবশ্য সম্পদকরের বিরোধী নন। তাঁদের মধ্যে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন ৪ হাজার ৫১২ জন।
এই কর আরোপের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যসেবা খাতে সম্ভাব্য অর্থসংকট মোকাবিলা করা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত আইনের প্রভাবে ফেডারেল সরকার থেকে স্বাস্থ্য খাতে পাওয়া অনুদান কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় এই তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন-ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়েস্টের প্রধান কর্মকর্তা সুজান জিমেনেজ জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ঠেকাতে এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ জরুরি। তাঁর মতে, নতুন উদ্যোগ নেওয়া না হলে অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি আছে।
তবে প্রস্তাবটি নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। এর বিরোধীদের মধ্যে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম অন্যতম। সমালোচকদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো, অতিরিক্ত করের চাপে ধনকুবেররা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত হতে পারেন, যা উল্টো রাজ্যের আয়কর রাজস্ব কমিয়ে দেবে। ইতিমধ্যে ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রিন, পিটার থিয়েল, ট্রাভিস কালানিক এবং ডন হ্যাংকির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাজ্য ছেড়েছেন। ডন হ্যাংকির দাবি, এই ধরনের করের কারণেই তাঁকে ব্যবসা ও আবাস স্থানান্তর করতে হয়েছে। প্রযুক্তি, বিনোদন ও অর্থনীতির বড় কেন্দ্র এই অঙ্গরাজ্য। কিন্তু প্রস্তাবিত করের কারণে তাঁকে এই রাজ্য ছাড়তে হয়েছে। এ ধরনের কর ধনীদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে পারে, তবে এর প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন।
ক্যালিফোর্নিয়া বরাবরই ধনকুবেরদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে মার্ক জাকারবার্গ, জর্জ লুকাস কিংবা কিম কার্ডাশিয়ানের মতো বিত্তবানদের বসতি থাকলেও রাজ্যে গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও ব্যাপক। এই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যই কর বিতর্কের অন্যতম অনুষঙ্গ। করের পক্ষে থাকা এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং টম স্টেয়ারের মতো ব্যক্তিত্বরা ইতিবাচক মত দিলেও, বিরোধিতার পথে হাঁটছেন অনেকে। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের তথ্যমতে, গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। মার্ক জাকারবার্গও ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে স্থায়ী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন বলে জানা গেছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তাঁর করের দায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সম্পদ কর থেকে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি মূলত করের কাঠামো, ছাড়, ফাঁকি রোধ এবং ধনীদের আচরণের ওপর নির্ভর করে। তাই এই করের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বার্কলি ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস যৌথভাবে গত ১৫ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর একটি জনমত জরিপ চালায়। প্রায় ৭ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ শতাংশ ভোটার সম্পদ করের পক্ষে এবং ৪২ শতাংশ বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এখনো ১৩ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন, যা নির্বাচনের দিন এই সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। জরিপে অংশ নেন ৬ হাজার ৯৮৯ জন নিবন্ধিত ভোটার।
রিপোর্টার নাম: 
























