Hi

০৬:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয় নিয়ে ফ্রান্সে চাঞ্চল্যকর বিতর্ক: আকস্মিক ডোপ টেস্ট বন্ধের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রীর

১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের দীর্ঘ আড়াই দশক পর ফরাসি ফুটবলে সৃষ্টি হয়েছে এক তোলপাড় সৃষ্টি করা নতুন বিতর্ক। শিরোপাজয়ী ফরাসি জাতীয় দলের মেগা টুর্নামেন্টটির পূর্বে আকস্মিক ডোপ পরীক্ষা বন্ধ রাখার বিস্ফোরক তথ্য সম্প্রতি স্বীকার করেছেন দেশটির তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী মারি-জর্জ বুঁফে। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় এক অর্জনের পেছনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের গোপন অধ্যায় জনসমক্ষে উন্মোচিত হলো।

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের জীবন ও ক্যারিয়ারভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘জিদান, দ্য ক্রিয়েশন অব আ লিজেন্ড’-এ সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী বুঁফে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ফরাসি স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের ওপর কোনো প্রকার আকস্মিক বা সারপ্রাইজ ডোপিং পরীক্ষা না চালানোর একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ ২০১৩ সালে ফরাসি সেনেটের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশনের সামনে শপথ নিয়ে দেওয়া জবানবন্দিতে বুঁফে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন। নিজের সেই আগের অবস্থান থেকে সরে এসে প্রায় তিন দশক পর তার এই নতি স্বীকার ফরাসি ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৯৭ সালে, যখন ফ্রান্সে বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ফরাসি জাতীয় ফুটবল দলের অনুশীলন ক্যাম্পে আকস্মিকভাবে ডোপিং পরীক্ষা চালায় অ্যান্টি-ডোপিং কর্তৃপক্ষ। যদিও সেই পরীক্ষায় সব ফুটবলারের ফলাফল নেগেটিভ এসেছিল, তথাপি ঘটনাটি ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) এবং তৎকালীন মূল কোচ আইমে জ্যাকেকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে তোলে। দলীয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের আচমকা পরীক্ষা খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নষ্ট করছিল এবং বিশ্বজয়ের মূল লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছিল। সেই চাপ ও অসন্তোষের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ডোপ পরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধের নীতিগত পথ বেছে নেওয়া হয়।

সে সময় ফ্রান্সের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডোপ টেস্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. আলাঁ গার্নিয়েই মূলত এই অনিয়মের বিস্তারিত ফাঁস করেন। ড. গার্নিয়েই দাবি করেন, বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলোয়াড়দের আর কোনোভাবে বিরক্ত না করার জন্য স্বয়ং বুঁফেই তাকে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। কোনো লিখিত নথি যেন তৈরি না হয়, সে উদ্দেশ্যেই সমস্ত নির্দেশনা কেবল মুখে মুখে প্রদান করা হয়েছিল। সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী বুঁফে চিকিৎসকের এই দাবি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ডা. গার্নিয়েই যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য এবং এটি ছিল তৎকালীন সরকারের একধরনের পিছু হটা বা আপস। তিনি ইঙ্গিত দেন, দেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখতে এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্তটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে পরামর্শক্রমেই গৃহীত হয়েছিল।

যদিও ১৯৯৮ সালের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে পরাস্ত করে জিনেদিন জিদানের জোড়া গোলে প্রথমবার বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরেছিল ফ্রান্স, কিন্তু এত বছর পর প্রাক্তন মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি সেই ঐতিহাসিক সাফল্যকে ঘিরে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্ন তুলে দিল। একই সাথে ২০১৩ সালের সেনেট তদন্তে বুঁফের মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি সামনে আসায় ফরাসি ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতা নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। ফরাসি ফুটবলের এই পুরোনো বিতর্ক এখন নতুন রূপ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।

জনপ্রিয়

বাগেরহাটে রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড: বসতঘর থেকে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয় নিয়ে ফ্রান্সে চাঞ্চল্যকর বিতর্ক: আকস্মিক ডোপ টেস্ট বন্ধের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রীর

আপডেট : ০৩:২২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের দীর্ঘ আড়াই দশক পর ফরাসি ফুটবলে সৃষ্টি হয়েছে এক তোলপাড় সৃষ্টি করা নতুন বিতর্ক। শিরোপাজয়ী ফরাসি জাতীয় দলের মেগা টুর্নামেন্টটির পূর্বে আকস্মিক ডোপ পরীক্ষা বন্ধ রাখার বিস্ফোরক তথ্য সম্প্রতি স্বীকার করেছেন দেশটির তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী মারি-জর্জ বুঁফে। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় এক অর্জনের পেছনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের গোপন অধ্যায় জনসমক্ষে উন্মোচিত হলো।

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের জীবন ও ক্যারিয়ারভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘জিদান, দ্য ক্রিয়েশন অব আ লিজেন্ড’-এ সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী বুঁফে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ফরাসি স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের ওপর কোনো প্রকার আকস্মিক বা সারপ্রাইজ ডোপিং পরীক্ষা না চালানোর একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ ২০১৩ সালে ফরাসি সেনেটের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশনের সামনে শপথ নিয়ে দেওয়া জবানবন্দিতে বুঁফে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন। নিজের সেই আগের অবস্থান থেকে সরে এসে প্রায় তিন দশক পর তার এই নতি স্বীকার ফরাসি ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৯৭ সালে, যখন ফ্রান্সে বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ফরাসি জাতীয় ফুটবল দলের অনুশীলন ক্যাম্পে আকস্মিকভাবে ডোপিং পরীক্ষা চালায় অ্যান্টি-ডোপিং কর্তৃপক্ষ। যদিও সেই পরীক্ষায় সব ফুটবলারের ফলাফল নেগেটিভ এসেছিল, তথাপি ঘটনাটি ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) এবং তৎকালীন মূল কোচ আইমে জ্যাকেকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে তোলে। দলীয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের আচমকা পরীক্ষা খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নষ্ট করছিল এবং বিশ্বজয়ের মূল লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছিল। সেই চাপ ও অসন্তোষের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ডোপ পরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধের নীতিগত পথ বেছে নেওয়া হয়।

সে সময় ফ্রান্সের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডোপ টেস্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. আলাঁ গার্নিয়েই মূলত এই অনিয়মের বিস্তারিত ফাঁস করেন। ড. গার্নিয়েই দাবি করেন, বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলোয়াড়দের আর কোনোভাবে বিরক্ত না করার জন্য স্বয়ং বুঁফেই তাকে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। কোনো লিখিত নথি যেন তৈরি না হয়, সে উদ্দেশ্যেই সমস্ত নির্দেশনা কেবল মুখে মুখে প্রদান করা হয়েছিল। সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী বুঁফে চিকিৎসকের এই দাবি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ডা. গার্নিয়েই যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য এবং এটি ছিল তৎকালীন সরকারের একধরনের পিছু হটা বা আপস। তিনি ইঙ্গিত দেন, দেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখতে এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্তটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে পরামর্শক্রমেই গৃহীত হয়েছিল।

যদিও ১৯৯৮ সালের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে পরাস্ত করে জিনেদিন জিদানের জোড়া গোলে প্রথমবার বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরেছিল ফ্রান্স, কিন্তু এত বছর পর প্রাক্তন মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি সেই ঐতিহাসিক সাফল্যকে ঘিরে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্ন তুলে দিল। একই সাথে ২০১৩ সালের সেনেট তদন্তে বুঁফের মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি সামনে আসায় ফরাসি ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতা নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। ফরাসি ফুটবলের এই পুরোনো বিতর্ক এখন নতুন রূপ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।