Hi

০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। নয়াদিল্লি থেকে পরিচালিত এই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমের সংবাদ সম্মেলনে তাঁর এই রাজনৈতিক হুংকার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া শেখ হাসিনার এই আকস্মিক ঘোষণা এবং তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ করে দেওয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কড়া নোট বা তীব্র প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ভিনদেশ থেকে এ ধরনের উসকানিমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখা এবং নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগকে পুনরায় মাঠে সক্রিয় করার একটি মরিয়া ও সুদূরপ্রসারী কৌশল। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের বাইরে থাকা এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় তিনি এই ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাধারণ ছাত্র-জনতার অবস্থান অত্যন্ত শক্ত রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীজনরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার মাত্রই তাঁকে আইনশৃঙ্খলার মুখোমুখি হতে হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু গোপন অনুসারী বা কট্টর সমর্থক এই ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা রোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার যেকোনো ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে শীতলতা ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছে। শেখ হাসিনাকে ভারতের পক্ষ থেকে আশ্রয় প্রদান এবং পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সুযোগ প্রদানের বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণ ও নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লি যদি এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মদদ অব্যাহত রাখে, তবে তা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারত্ব ও আস্থার সম্পর্কে স্থায়ী ফাটল ধরাতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা তার সার্বভৌমত্ব ও আইনি মার্যাদা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

জনপ্রিয়

সমুদ্রের নিচে মানব বসতির নতুন অধ্যায়: ফ্লোরিডা উপকূলে স্থাপন করা হলো ‘ভ্যানগার্ড’ স্টেশন

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

আপডেট : ০১:২৩:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। নয়াদিল্লি থেকে পরিচালিত এই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমের সংবাদ সম্মেলনে তাঁর এই রাজনৈতিক হুংকার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া শেখ হাসিনার এই আকস্মিক ঘোষণা এবং তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ করে দেওয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কড়া নোট বা তীব্র প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ভিনদেশ থেকে এ ধরনের উসকানিমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখা এবং নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগকে পুনরায় মাঠে সক্রিয় করার একটি মরিয়া ও সুদূরপ্রসারী কৌশল। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের বাইরে থাকা এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় তিনি এই ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাধারণ ছাত্র-জনতার অবস্থান অত্যন্ত শক্ত রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীজনরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার মাত্রই তাঁকে আইনশৃঙ্খলার মুখোমুখি হতে হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু গোপন অনুসারী বা কট্টর সমর্থক এই ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা রোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার যেকোনো ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে শীতলতা ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছে। শেখ হাসিনাকে ভারতের পক্ষ থেকে আশ্রয় প্রদান এবং পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সুযোগ প্রদানের বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণ ও নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লি যদি এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মদদ অব্যাহত রাখে, তবে তা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারত্ব ও আস্থার সম্পর্কে স্থায়ী ফাটল ধরাতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা তার সার্বভৌমত্ব ও আইনি মার্যাদা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে।