দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জটিল রোগের চিকিৎসা শেষে অবশেষে স্বদেশে ফিরছেন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে তিনি মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হয়ে বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গতকাল রবিবার গভীর রাতে বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, তিনি স্ত্রী ও জামাতাকে সাথে নিয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। আজ সোমবার বিকেলে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। নিসচার ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ এই তথ্যটি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, যা তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
গত বছরের এপ্রিল মাসে মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ার পর থেকেই ইলিয়াস কাঞ্চন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতাল এবং মেয়ে ইমা ইসলামের বাসভবনে অবস্থান করে তাঁর চিকিৎসা পরিচালিত হয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসে সেখানকার একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা টিউমারের একটি বড় অংশ সফলভাবে অপসারণ করতে পারলেও, ঝুঁকির কারণে সম্পূর্ণ অংশ সরাতে পারেননি। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা তাঁর এই জটিল রোগকে ব্রেন ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা তাঁর পরিবার ও ভক্তদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়।
অস্ত্রোপচারের পর ইলিয়াস কাঞ্চনকে এক দীর্ঘ ও কঠোর চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। চিকিৎসার প্রথম ধাপে টানা তিন মাস ধরে তাঁর কেমোথেরাপি চলে। এর পাশাপাশি চলে দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রায় ১২ সপ্তাহের চিকিৎসাকালীন সপ্তাহে পাঁচ দিন করে তাকে মোট ষাটেরও বেশি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। এরপর তিনি তিন মাসের প্রথম ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ করে আরও তিন মাসের দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে তিন ধাপে তাকে প্রায় একশ’র মতো কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে, যা এই অভিনেতার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা ছিল।
এত দীর্ঘ ও নিবিড় চিকিৎসা গ্রহণ সত্ত্বেও ইলিয়াস কাঞ্চনের শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। লিটন এরশাদ প্রথম আলোকে জানান, “দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বাইরে থাকতে থাকতে ইলিয়াস কাঞ্চন ভাই মানসিকভাবে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। দেশের প্রতি তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। পরিবারের কাছেও তিনি বলছিলেন যে যেহেতু তৃতীয় ধাপের থেরাপি শেষ হয়েছে, তাই তিনি কয়েক মাসের জন্য দেশে ফিরতে চান।” কাঞ্চন ভাইয়ের এই গভীর ইচ্ছার কারণেই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে উল্লেখ করে এরশাদ আরও বলেন, “তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয় এবং উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতিও হয়নি। গত ৩০শে জুলাই তৃতীয় ধাপের থেরাপি শেষ হয়েছে। এরপর তাঁর নতুন চিকিৎসা শুরু হবে, তবে তার আগে তিনি কিছুদিন দেশে কাটাতে চেয়েছেন।”
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে লিটন এরশাদ আরও জানান যে, অস্ত্রোপচারের পর ক্যান্সার যে স্থানে ছিল, সেখানেই এখনো সীমাবদ্ধ আছে এবং শরীরের অন্য কোথাও তা ছড়িয়ে পড়েনি। এটিকে চিকিৎসকরা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসার জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। এরশাদ আরও উল্লেখ করেন, “কাঞ্চন ভাই এখন ধীরে ধীরে কথা বলতে পারেন, তবে তাঁর কথাবার্তায় এখনো জড়তা রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, তিনি কয়েক মিনিট কথা বলার পর পুরো বাক্য শেষ করতে পারেন না। একটি পূর্ণ বাক্য শেষ করতেও তাঁকে বেশ কষ্ট হয়।” যদিও তাঁর খাবারদাবার মোটামুটি স্বাভাবিক আছে, তবে নিয়মিত ও সময়মতো খাবার গ্রহণের অভ্যাসটিও আগের মতো নেই বলে জানান লিটন এরশাদ। এই মহানায়কের সুস্থ জীবনের জন্য দেশজুড়ে তাঁর ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা প্রার্থনা করছেন।
রিপোর্টার নাম: 






















