Hi

১২:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাবিশ্বের গোপন রহস্য: পরমাণু এবং এর গঠন নিয়ে এক অসামান্য কৌতূহলোদ্দীপক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেদন

আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের প্রতিটি বস্তুই একটি সূক্ষ্ম এবং বিস্ময়কর রহস্যের অংশ। বই, স্কুলব্যাগ, গাছের পাতা, এক গ্লাস পানি কিংবা মানবদেহ—সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো ‘পরমাণু’। খালি চোখে অদৃশ্য এই ক্ষুদ্রতম কণাটি সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টির মৌলিক উপাদান। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, কল্পনার কোনো সীমা নেই, আর এই কল্পনার পথ ধরেই বিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পদার্থের এই মৌলিক কণার রহস্য ভেদ করে চলেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস থেকে শুরু করে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায় পরমাণুর ধারণা আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

পরমাণুর আকার এতটাই ক্ষুদ্র যে মানুষের সাধারণ বোধশক্তির বাইরে। বিখ্যাত লেখক বিল ব্রাইসনের হিসাব অনুযায়ী, মানবদেহে এমন অসংখ্য পরমাণু রয়েছে যা একসময় ঐতিহাসিক নাট্যকার উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের শরীরেও বিদ্যমান ছিল। ১৮০৩ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন ডাল্টন প্রথম পরমাণু তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে জে জে থমসন এবং আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের গবেষণায় পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন আরও স্পষ্ট হয়। রাদারফোর্ডের মডেল অনুযায়ী, পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি অত্যন্ত ভারী এবং ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস, যা প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত। আর এর চারপাশের বিশাল শূন্যতার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে ইলেকট্রন। একটি পরমাণুর মধ্যে প্রোটনের সংখ্যাই নির্ধারণ করে দেয় সেটি কোন মৌল, যেমন একটি প্রোটন মানে হাইড্রোজেন এবং ছয়টি প্রোটন মানে কার্বন।

প্রকৃতিতে পরমাণুগুলোর বৈচিত্র্য এবং তাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে আমাদের চারপাশের নানা বস্তু। অক্সিজেনের পরমাণু সাধারণত জোড়ায় থাকলেও কার্বন পরমাণুগুলো দলবদ্ধভাবে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে, যার ফলশ্রুতিতে হীরা কিংবা পেন্সিলের শিসের মতো শক্ত পদার্থ গঠিত হয়। পরমাণুর ইলেকট্রন ও প্রোটনের চার্জের ভারসাম্যে যখন কোনো ব্যাঘাত ঘটে, তখন সেগুলো আয়নে রূপান্তরিত হয়। এই আয়নগুলোর পারস্পরিক আকর্ষণের মাধ্যমেই টেবিলের সাধারণ লবণ থেকে শুরু করে জীবনের অপরিহার্য জৈব অণুগুলো সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত জীবজগতের প্রাণচাঞ্চল্যের পেছনে কার্বন পরমাণুর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, যা সমুদ্রের গভীরের ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আকাশচারী পাখির শরীরেও বিদ্যমান।

বিজ্ঞান থেমে নেই; পার্টিকেল এক্সিলারেটরের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পরমাণুকে আরও ভেঙে কোয়ার্কের মতো আরও ক্ষুদ্র কণা আবিষ্কার করেছেন। ২০১২ সালে হিগস বোসন কণার সন্ধান মেলার পর মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এক বিরাট মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে ন্যানোপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিজ্ঞানীরা আক্ষরিক অর্থেই পৃথক পরমাণু নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন, যা ক্যানসারের চিকিৎসাসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। প্রাচীন দার্শনিকদের কল্পনা থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর ল্যাবরেটরির অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত পরমাণুর এই অবিশ্বাস্য অভিযাত্রা মানবসভ্যতাকে এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

জনপ্রিয়

এসএসসি ২০২৭ পরীক্ষার্থীদের বিজ্ঞান প্রস্তুতি: পুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জীবনধারা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মহাবিশ্বের গোপন রহস্য: পরমাণু এবং এর গঠন নিয়ে এক অসামান্য কৌতূহলোদ্দীপক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেদন

আপডেট : ১০:২০:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের প্রতিটি বস্তুই একটি সূক্ষ্ম এবং বিস্ময়কর রহস্যের অংশ। বই, স্কুলব্যাগ, গাছের পাতা, এক গ্লাস পানি কিংবা মানবদেহ—সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো ‘পরমাণু’। খালি চোখে অদৃশ্য এই ক্ষুদ্রতম কণাটি সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টির মৌলিক উপাদান। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, কল্পনার কোনো সীমা নেই, আর এই কল্পনার পথ ধরেই বিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পদার্থের এই মৌলিক কণার রহস্য ভেদ করে চলেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস থেকে শুরু করে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায় পরমাণুর ধারণা আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

পরমাণুর আকার এতটাই ক্ষুদ্র যে মানুষের সাধারণ বোধশক্তির বাইরে। বিখ্যাত লেখক বিল ব্রাইসনের হিসাব অনুযায়ী, মানবদেহে এমন অসংখ্য পরমাণু রয়েছে যা একসময় ঐতিহাসিক নাট্যকার উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের শরীরেও বিদ্যমান ছিল। ১৮০৩ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন ডাল্টন প্রথম পরমাণু তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে জে জে থমসন এবং আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের গবেষণায় পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন আরও স্পষ্ট হয়। রাদারফোর্ডের মডেল অনুযায়ী, পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি অত্যন্ত ভারী এবং ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াস, যা প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত। আর এর চারপাশের বিশাল শূন্যতার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে ইলেকট্রন। একটি পরমাণুর মধ্যে প্রোটনের সংখ্যাই নির্ধারণ করে দেয় সেটি কোন মৌল, যেমন একটি প্রোটন মানে হাইড্রোজেন এবং ছয়টি প্রোটন মানে কার্বন।

প্রকৃতিতে পরমাণুগুলোর বৈচিত্র্য এবং তাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে আমাদের চারপাশের নানা বস্তু। অক্সিজেনের পরমাণু সাধারণত জোড়ায় থাকলেও কার্বন পরমাণুগুলো দলবদ্ধভাবে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে, যার ফলশ্রুতিতে হীরা কিংবা পেন্সিলের শিসের মতো শক্ত পদার্থ গঠিত হয়। পরমাণুর ইলেকট্রন ও প্রোটনের চার্জের ভারসাম্যে যখন কোনো ব্যাঘাত ঘটে, তখন সেগুলো আয়নে রূপান্তরিত হয়। এই আয়নগুলোর পারস্পরিক আকর্ষণের মাধ্যমেই টেবিলের সাধারণ লবণ থেকে শুরু করে জীবনের অপরিহার্য জৈব অণুগুলো সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত জীবজগতের প্রাণচাঞ্চল্যের পেছনে কার্বন পরমাণুর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, যা সমুদ্রের গভীরের ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আকাশচারী পাখির শরীরেও বিদ্যমান।

বিজ্ঞান থেমে নেই; পার্টিকেল এক্সিলারেটরের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পরমাণুকে আরও ভেঙে কোয়ার্কের মতো আরও ক্ষুদ্র কণা আবিষ্কার করেছেন। ২০১২ সালে হিগস বোসন কণার সন্ধান মেলার পর মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এক বিরাট মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে ন্যানোপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিজ্ঞানীরা আক্ষরিক অর্থেই পৃথক পরমাণু নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন, যা ক্যানসারের চিকিৎসাসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। প্রাচীন দার্শনিকদের কল্পনা থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর ল্যাবরেটরির অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত পরমাণুর এই অবিশ্বাস্য অভিযাত্রা মানবসভ্যতাকে এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।