Hi

০২:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক একটি যুগান্তকারী যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে পরিচিত এই কৌশলগত সমঝোতাটি পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়। এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তা সামগ্রিকভাবে তিন দেশের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে এবং সম্মিলিতভাবে এর জবাব দেওয়া হবে।

পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তিনটি দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্বের আত্মিক বন্ধন এবং ইসলামি সংহতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চুক্তি তাদের পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় করবে। এটি মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিন দেশের দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব সফর করেন এবং মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। একই সময়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও রিয়াদে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই চুক্তি স্বাক্ষরে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে ঐতিহ্যগত মার্কিন নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর থেকে এই দেশগুলোর আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এই তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি একীভূত হয়ে একটি নতুন প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করেছে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। এই দেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক অভিজ্ঞতা, প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতা এবং আর্থিক শক্তি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তি কোনো সামরিক জোটের চেয়েও বেশি কিছু; এটি মূলত আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

এদিকে এই চুক্তির পর বিভিন্ন মহলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও, দেশটির কতিপয় নীতিনির্ধারক ও সংসদ সদস্য এই চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল বা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও, পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে এক নতুন শক্তির মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন। ফিলিস্তিন ইস্যু, গাজায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই ঐক্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জনপ্রিয়

ইলন মাস্কের স্টারলিংককে টেক্কা দিতে ইউরোপের নতুন উচ্চাভিলাষী স্যাটেলাইট প্রজেক্ট ‘আইরিস-২’

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি

আপডেট : ১১:৫২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক একটি যুগান্তকারী যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে পরিচিত এই কৌশলগত সমঝোতাটি পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়। এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তা সামগ্রিকভাবে তিন দেশের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে এবং সম্মিলিতভাবে এর জবাব দেওয়া হবে।

পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তিনটি দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্বের আত্মিক বন্ধন এবং ইসলামি সংহতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চুক্তি তাদের পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় করবে। এটি মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিন দেশের দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব সফর করেন এবং মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। একই সময়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও রিয়াদে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই চুক্তি স্বাক্ষরে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে ঐতিহ্যগত মার্কিন নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর থেকে এই দেশগুলোর আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এই তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি একীভূত হয়ে একটি নতুন প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করেছে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। এই দেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক অভিজ্ঞতা, প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতা এবং আর্থিক শক্তি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তি কোনো সামরিক জোটের চেয়েও বেশি কিছু; এটি মূলত আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

এদিকে এই চুক্তির পর বিভিন্ন মহলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও, দেশটির কতিপয় নীতিনির্ধারক ও সংসদ সদস্য এই চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল বা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও, পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে এক নতুন শক্তির মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন। ফিলিস্তিন ইস্যু, গাজায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই ঐক্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।