কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২০২৪ সালের ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’-এর শহীদ আহসান হাবিবের স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক সম্প্রতি দাবি করেছেন যে আহসান হাবিব ‘জুলাই যোদ্ধা’ ছিলেন না এবং তার নাম সরকারি গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চকরিয়া–পেকুয়া আসনের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক, যিনি আহসান হাবিবকে জুলাই আন্দোলনের একজন শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
গত বুধবার বিকেলে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’-এর দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় এনামুল হক এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা কারা?’ এবং নিজেই উত্তর দেন যে, ‘যাঁরা জুলাই যুদ্ধ করতে গিয়ে বুকের রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, হাসিনাকে বিমানে তুলে দিয়েছেন, তারাই যোদ্ধা।’ আহসান হাবিবের বিষয়ে তার মন্তব্য ছিল, তিনি জুলাই যোদ্ধাদের মারতে গিয়েছিলেন, তাই তার নাম গেজেট থেকে বাদ দেওয়া উচিত। এনামুল হক আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই আন্দোলনে আহসান হাবিবের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং তার পরিবার তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেছিল।
বিএনপি নেতার দাবি অনুযায়ী, আহসান হাবিব মারা যাওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হেলালের নেতৃত্বে তার বাবা, মা ও চাচা গণভবনে গিয়েছিলেন। সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের ‘আবেগঘন কোলাকুলি’ হয় এবং শেখ হাসিনা তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে পরিবারকে দশ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। এনামুল হকের মতে, এই আর্থিক সহায়তা গ্রহণ আহসান হাবিবের ‘জুলাই যোদ্ধা’র মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
এনামুল হকের এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল্লাহ আল ফারুক তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি বিস্তারিত পোস্ট দেন। এই পোস্টে তিনি জুলাই আন্দোলনের সময়ে আহসান হাবিবের দেওয়া কিছু ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট সংযুক্ত করেন, যা তার আন্দোলনের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে বলে ফারুক দাবি করেন।
আবদুল্লাহ আল ফারুক তার পোস্টে দৃঢ়ভাবে লেখেন, ‘আহসান হাবিব জুলাই আন্দোলনে কক্সবাজারের রাজপথে নিহত শহীদ। জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই সে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে নিয়মিত পোস্ট করেছে।’ তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের উদাহরণ টেনে বলেন যে, সারজিস আলমও একসময় ছাত্রলীগ করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনে সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, একজন ব্যক্তির পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিচয় সবসময় তার শেষকৃত্যের পরিচায়ক নয়। ফারুক আরও বলেন, ‘একজন শহীদের ব্যাপারে অযাচিত মন্তব্য আমাদের আহত করে। আহসান হাবিব, ওয়াসিম আকরাম আমাদের প্রেরণা, চকরিয়া–পেকুয়ার গর্বের ধন।’ তার এই মন্তব্য আহসান হাবিবকে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আবারও স্পষ্ট করে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কক্সবাজার শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহসান হাবিব নিহত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে তার পরিবারকে ডেকে দশ লাখ টাকার চেক তুলে দিয়েছিলেন, যা তখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীতে, ২০২৫ সালে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান আহসান হাবিবের কবর জিয়ারত করেন, যা তার প্রতি জামায়াতের সমর্থন এবং তাকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে, আহসান হাবিবের মর্যাদা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যান বিদ্যমান, যা এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। এই বিতর্ক কেবল একজন ব্যক্তির স্বীকৃতি নিয়ে নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক বয়ান নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
রিপোর্টার নাম: 



















