পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জোরালো দাবিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা এই সংবেদনশীল অঞ্চল থেকে সেনা হটানোর কথা বলেন, মূলত রাষ্ট্রপঞ্জি, জাতীয় রাজনীতি এবং সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের কোনো সম্যক ধারণাই নেই। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
বুধবার বিকেলে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ষড়যন্ত্র, সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক ওই সেমিনারে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। যদিও সামরিক কার্যক্রমে কোনো ত্রুটি বা সমালোচনার অবকাশ থাকতে পারে, তবে তা আলোচনার টেবিলে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু পুরো অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবি দেশের অখণ্ডতার জন্য বড় হুমকি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, ১৯৭২ সাল থেকেই একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্যবহারের বহুমুখী পাঁয়তারা চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, পাহাড়ে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে আধুনিক মেশিনগানসহ ভারী অস্ত্রশস্ত্র কীভাবে পৌঁছায় এবং কারা তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়। ভারত ও মিয়ানমার ব্যতিরেকে অন্য কোনো শক্তির পক্ষে এই ধরনের অস্ত্র সরবরাহ বা রসদ জোগানো অবাস্তব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বনাম আদিবাসী বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক জানান, বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দবন্ধটিই আইনগতভাবে সঠিক এবং বাস্তবসম্মত। তাঁর মতে, ‘আদিবাসী’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের মূল বা প্রথম অধিবাসীদের বোঝায়, অথচ বাঙালি জনগোষ্ঠী দীর্ঘ হাজার বছর ধরে এই জনপদে বসবাস করে আসছে। ফলে পাহাড়ের নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়কে এককভাবে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
দেশের অভ্যন্তরে গোয়েন্দা নজরদারির বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফুটপাতের ক্ষুদ্র হকার থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতেও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর চর ও সোর্স সক্রিয় রয়েছে। এসব রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চিহ্নিত করা সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার সময় ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে উগ্র মৌলবাদী ও সংখ্যালঘু নিপীড়ক হিসেবে উপস্থাপন করার অসৎ উদ্দেশ্যে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু ভারত এখনও বিভিন্ন অজুহাতে বাংলাদেশের ওপর চাপ ও দরকষাকষির পুরনো নীতি বজায় রেখে ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফরের সময়ও একটি পক্ষ কৃত্রিমভাবে সংখ্যালঘু ইস্যু তৈরি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন নুরুল হক। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খাঁন। এছাড়া এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান পাহাড়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মূলোৎপাটন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুনর্বিবেচনা, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় জড়িতদের কঠোর আইনের আওতায় আনা, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও বিজিবির বিওপি বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেনাসদস্যদের ঝুঁকি ভাতাসহ মনোবল বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পাহাড়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সিএমএইচ স্থাপন।
রিপোর্টার নাম: 


















