যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে বিএনপির একদল নেতাকর্মীর মদদে এই ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে জেলা বিএনপি জানিয়েছে, এটি সম্পূর্ণ স্থানীয় এলাকাবাসী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যকার একটি বিরোধের ফলাফল, যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো দূরতম সম্পর্ক নেই।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূলত যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকার প্রফেসর পাড়ায় অবস্থিত ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’ নামক একটি কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার যাতায়াতের গলিপথটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় এবং আশপাশে জনবসতি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নানাবিধ অসন্তোষ বিরাজ করছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়ের কারণে ওই এলাকার স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। এই বিরোধের জের ধরে সোমবার সংসদ সদস্যের মেয়ে অনন্যা মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করা হলেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি।
পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে, যখন সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে সশরীরে ওই মাদ্রাসায় প্রবেশ করেন এবং ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে এমপি গোলাম রসুলের বাসভবনের দিকে এগিয়ে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ির মূল ফটক বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ও অভিভাবকরা বাসভবনের ফটক, জানালার গ্লাস এবং নিরাপত্তা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সন্ধ্যায় পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তিনি জানান, উদ্ভূত এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আগামী বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সকল পক্ষের অংশগ্রহণে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে হামলার পর থেকে সংসদ সদস্যের পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তারহীনতায় ভুগছেন এবং বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এমপির বাসভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদে এই সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি দেশবাসীকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। দলটির প্রতিবাদ জানাতে সন্ধ্যায় যশোর শহরের সিভিল কোর্ট মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয় যা বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে দড়াটানা মোড়ে গিয়ে সমাপ্ত হয়।
অন্যদিকে, জামায়াতের এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সংসদ সদস্যের বাসভবনে হামলার ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। এটি একান্তই স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও এর অভিভাবকদের সঙ্গে এমপির পরিবারের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও স্থানীয় বিরোধের ফল। তিনি দাবি করেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বরং স্থানীয়দের শান্ত রাখার এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নেতাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রশাসন আশা করছে, আগামী বুধবারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের হয়ে আসবে।
নিজস্ব প্রতিনিধি 





















