সম্প্রতি সমাপ্ত ফিফা বিশ্বকাপের রেশ এখনও কাটেনি আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে। ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর এক সপ্তাহের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও, দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের দাবি অনুযায়ী এই টুর্নামেন্ট কেন্দ্র করে চলা বিতর্ক থামেনি। কট্টর ডানপন্থী এই রাষ্ট্রপ্রধান অভিযোগ করেছেন যে, আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দলের সমালোচনা, সমর্থকদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ এবং ফিফা কর্তৃক লিওনেল মেসিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো বিষয়গুলোর পেছনে একটি সুসংগঠিত ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ সক্রিয় ছিল। গত রোববার একটি স্থানীয় রেডিও স্টেশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন তিনি।
মিলেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন যে, এই কথিত আন্তর্জাতিক প্রচারণায় প্রত্যক্ষ অর্থায়ন করেছে মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং লাতিন আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সরকার। তাঁর ভাষ্যমতে, এটি মূলত প্রগতিশীল ঘরানার সেই সমস্ত মানুষের রাজনৈতিক চাল, যারা মুক্ত বাজার ও মুক্ত চিন্তার দর্শনকে কোনোভাবেই সফল হতে দেখতে চায় না। বিশেষ করে, ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রশাসন এই তহবিলের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে বুয়েনস এইরেসের রাজনৈতিক অঙ্গনে মিলেইয়ের এমন মন্তব্যের ফলে নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের সরকারের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই প্রেসিডেন্ট মিলেই এই তথাকথিত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সামনে এনেছেন। বর্তমানে আর্জেন্টিনায় কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে জীবনযাত্রার মান কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তবে মিলেইয়ের এই বয়ান দেশটির একটি অংশের মানুষের মধ্যে বেশ ভালোভাবেই সাড়া ফেলেছে। এমনকি যারা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী, তারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিরুদ্ধে চালানো আক্রমণাত্মক প্রচারণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে আর্জেন্টিনার কতিপয় সমর্থকের বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ফাইনালের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসন সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে আর্জেন্টিনার বর্ণবাদী অতীত নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। এর জবাবে মিলেই দাবি করেন, এই ধরনের সমালোচনার মূল দায় দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধী দলগুলোর, যারা বামপন্থী ওক আন্দোলনকে প্রশ্রয় দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। গত শনিবার ব্রাজিলের মাটিতে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি ব্রাজিলিয়ান সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করেন এবং লুলা দা সিলভাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
এদিকে গবেষক ও ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালানো বিভিন্ন প্রচারণার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষক নাতালিয়া আরুগেতে জানান, অনলাইনে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে একটি বৈরী আলোচনা থাকলেও, বিদেশি সরকারগুলোর প্রত্যক্ষ অর্থায়নে কোনো সুসংগঠিত প্রচারণার শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের সামরিক স্বৈরশাসনের আমলেও রাজনৈতিক সংকট ঢাকতে এ ধরনের ‘বহিঃশত্রু ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ প্রচার করার ঐতিহাসিক প্রবণতা ছিল। সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে প্রেসিডেন্ট মিলেইয়ের এই নতুন রাজনৈতিক কৌশল দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
রিপোর্টার নাম: 



















