Hi

০৪:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনাফে মানব পাচার রোধে প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত উদ্যোগের জোর দাবি

সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধ দমন করতে সংঘবদ্ধ চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন সেন্ট্রাল রিসোর্টের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত পৃথক দুটি কর্মশালায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মশালাগুলোতে গণমাধ্যমকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচারবিরোধী তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনে আরও বেশি দক্ষ করে তোলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সমাজের কার্যকর মেলবন্ধন তৈরি করা।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে টেকনাফ ও উখিয়ার ৪২ জন সংবাদকর্মী অংশগ্রহণ করেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বর্তমান অভিবাসন ধারার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, মানব পাচার বা মাদকের মতো জঘন্য অপরাধগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এ সময় তিনি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, সঠিক ও তথ্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন কেবল সাধারণ মানুষকে সচেতনই করে না, বরং অনেক জীবনকে বিপদের হাত থেকেও রক্ষা করতে পারে। প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, টেকনাফ উপকূলীয় এলাকাটি মানব পাচারের অন্যতম মূল ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ অনেক সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের আগে স্থানীয় সাংবাদিকেরা সঠিক তথ্য উদঘাটনে পিছিয়ে পড়েন। তিনি এই প্রবণতা কাটিয়ে উঠে আরও বেশি সাহসী ও অনুসন্ধানী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

অপরদিকে, বিকেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক দ্বিতীয় পর্বের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার মানব পাচারের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেতিবাচক প্রভাবগুলোর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মানব পাচারের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কিছু অর্থ আসলেও দিনশেষে তা দেশের মূল অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না, বরং এই অবৈধ অর্থ চক্রের শক্তি বাড়াতে এবং মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম এই অঞ্চলকে মানব পাচারের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে অভিহিত করে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রকিবুল হাসান এবং র‍্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার সোহেল রানা বক্তব্য রাখেন।

দিনব্যাপী এই আয়োজনে বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, এপিবিএন এবং আনসারসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বক্তারা আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করা, দ্রুততম সময়ে ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, এবং পাচারকারী চক্রের মূল আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে মানব পাচারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। টেকনাফ উপকূল দিয়ে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা রোধে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে কর্মশালায় মত প্রকাশ করা হয়।

জনপ্রিয়

সাভারে চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

টেকনাফে মানব পাচার রোধে প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত উদ্যোগের জোর দাবি

আপডেট : ১২:১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধ দমন করতে সংঘবদ্ধ চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন সেন্ট্রাল রিসোর্টের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত পৃথক দুটি কর্মশালায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মশালাগুলোতে গণমাধ্যমকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচারবিরোধী তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনে আরও বেশি দক্ষ করে তোলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সমাজের কার্যকর মেলবন্ধন তৈরি করা।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে টেকনাফ ও উখিয়ার ৪২ জন সংবাদকর্মী অংশগ্রহণ করেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বর্তমান অভিবাসন ধারার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, মানব পাচার বা মাদকের মতো জঘন্য অপরাধগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এ সময় তিনি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, সঠিক ও তথ্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন কেবল সাধারণ মানুষকে সচেতনই করে না, বরং অনেক জীবনকে বিপদের হাত থেকেও রক্ষা করতে পারে। প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, টেকনাফ উপকূলীয় এলাকাটি মানব পাচারের অন্যতম মূল ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ অনেক সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের আগে স্থানীয় সাংবাদিকেরা সঠিক তথ্য উদঘাটনে পিছিয়ে পড়েন। তিনি এই প্রবণতা কাটিয়ে উঠে আরও বেশি সাহসী ও অনুসন্ধানী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

অপরদিকে, বিকেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক দ্বিতীয় পর্বের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার মানব পাচারের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেতিবাচক প্রভাবগুলোর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মানব পাচারের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কিছু অর্থ আসলেও দিনশেষে তা দেশের মূল অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না, বরং এই অবৈধ অর্থ চক্রের শক্তি বাড়াতে এবং মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম এই অঞ্চলকে মানব পাচারের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে অভিহিত করে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রকিবুল হাসান এবং র‍্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার সোহেল রানা বক্তব্য রাখেন।

দিনব্যাপী এই আয়োজনে বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, এপিবিএন এবং আনসারসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বক্তারা আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করা, দ্রুততম সময়ে ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, এবং পাচারকারী চক্রের মূল আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে মানব পাচারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। টেকনাফ উপকূল দিয়ে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা রোধে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে কর্মশালায় মত প্রকাশ করা হয়।