Hi

১০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে সালিসের নামে নাতিকে নির্যাতন ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন বৃদ্ধ দাদা

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় মুঠোফোন চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক তরুণকে সালিসের নামে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই অমানবিক দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে নাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে যান তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ দাদা নবী হোসেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে উল্টো স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার কার্যালয়ের সামনে নির্মম মারধরের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ওই বৃদ্ধকে। গত রোববার রাত পৌনে নয়টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ গফরগাঁও ইউনিয়নের হাটপাড়া গ্রামের বাদল মার্কেটসংলগ্ন প্রধান সড়কে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে হাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়ার একটি দামি মুঠোফোন চুরি হয়। পরবর্তীতে ওই চুরির ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করে দুলালের ছেলে রবিনের পক্ষে নবী হোসেনের কুশীলব নাতি মো. রানার (২০) বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। ঘটনার তিন দিন আগে রানা কাজের তাগিদে এলাকায় ফেরেন। গত রোববার সন্ধ্যার পর স্থানীয় কয়েকজন তরুণ রানাকে জোরপূর্বক ধরে এনে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শামছুল ইসলাম ওরফে ফারুকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের সামনে বেঁধে ফেলে।

অভিযোগ উঠেছে, শামছুল ইসলামের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে কিংবা তাঁর কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে এই সালিসের নামে রানার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। নাতিকে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানোর খবর পেয়ে বৃদ্ধ নবী হোসেন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তিনি এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নাতিকে মারধর করতে নিষেধ করেন। কিন্তু নির্যাতনকারীরা তাঁর কথায় কান না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ ও আক্ষেপে বলেন, ‘এভাবে আস্তে আস্তে না মাইরা, একবারে মাইরা ফালাও।’ তাঁর এই প্রতিবাদী ও আক্ষেপসুলভ মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হামলাকারীরা।

পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হাতাহাতির একপর্যায়ে বৃদ্ধ নবী হোসেনকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পিচের সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাঁর বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসককে ডেকে প্রাথমিক পরীক্ষা করা হলে তিনি দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা রাত দশটার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাসের নেতৃত্বে পাগলা থানা পুলিশের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীদের ধরতে রাতভর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালায়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৌঁছানোর আগেই মূল অভিযুক্তসহ জড়িত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সোমবার সকালে পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।

পাগলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সালিসের নামে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এদিকে, ঘটনার পর অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শামছুল ইসলাম নিজের মুঠোফোন বন্ধ রাখেন এবং তাঁর ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে দাবি করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তাঁর কার্যালয়ে কোনো ধরনের সালিস বৈঠক বসেনি। তবে স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন বিচার-সালিসের নামে এমন অন্যায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে, যার পরিণতিতে আজ একজন নিরীহ বৃদ্ধকে প্রাণ হারাতে হলো। সমাজে এমন বিচারবহির্ভূত নির্যাতন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

জনপ্রিয়

২৫০ বোতল ভারতীয় মদ ও প্রাইভেটকারসহ ৪ জন গ্রেপ্তার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

ময়মনসিংহে সালিসের নামে নাতিকে নির্যাতন ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন বৃদ্ধ দাদা

আপডেট : ০৬:২২:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় মুঠোফোন চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক তরুণকে সালিসের নামে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই অমানবিক দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে নাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে যান তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ দাদা নবী হোসেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে উল্টো স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার কার্যালয়ের সামনে নির্মম মারধরের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ওই বৃদ্ধকে। গত রোববার রাত পৌনে নয়টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ গফরগাঁও ইউনিয়নের হাটপাড়া গ্রামের বাদল মার্কেটসংলগ্ন প্রধান সড়কে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে হাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়ার একটি দামি মুঠোফোন চুরি হয়। পরবর্তীতে ওই চুরির ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করে দুলালের ছেলে রবিনের পক্ষে নবী হোসেনের কুশীলব নাতি মো. রানার (২০) বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। ঘটনার তিন দিন আগে রানা কাজের তাগিদে এলাকায় ফেরেন। গত রোববার সন্ধ্যার পর স্থানীয় কয়েকজন তরুণ রানাকে জোরপূর্বক ধরে এনে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শামছুল ইসলাম ওরফে ফারুকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের সামনে বেঁধে ফেলে।

অভিযোগ উঠেছে, শামছুল ইসলামের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে কিংবা তাঁর কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে এই সালিসের নামে রানার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। নাতিকে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানোর খবর পেয়ে বৃদ্ধ নবী হোসেন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তিনি এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নাতিকে মারধর করতে নিষেধ করেন। কিন্তু নির্যাতনকারীরা তাঁর কথায় কান না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ ও আক্ষেপে বলেন, ‘এভাবে আস্তে আস্তে না মাইরা, একবারে মাইরা ফালাও।’ তাঁর এই প্রতিবাদী ও আক্ষেপসুলভ মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হামলাকারীরা।

পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হাতাহাতির একপর্যায়ে বৃদ্ধ নবী হোসেনকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পিচের সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাঁর বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসককে ডেকে প্রাথমিক পরীক্ষা করা হলে তিনি দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা রাত দশটার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাসের নেতৃত্বে পাগলা থানা পুলিশের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীদের ধরতে রাতভর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালায়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৌঁছানোর আগেই মূল অভিযুক্তসহ জড়িত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সোমবার সকালে পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।

পাগলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সালিসের নামে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এদিকে, ঘটনার পর অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শামছুল ইসলাম নিজের মুঠোফোন বন্ধ রাখেন এবং তাঁর ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে দাবি করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তাঁর কার্যালয়ে কোনো ধরনের সালিস বৈঠক বসেনি। তবে স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন বিচার-সালিসের নামে এমন অন্যায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে, যার পরিণতিতে আজ একজন নিরীহ বৃদ্ধকে প্রাণ হারাতে হলো। সমাজে এমন বিচারবহির্ভূত নির্যাতন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।