সকালের স্নিগ্ধ ভোরে টেবিলে রাখা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির পেয়ালায় সামান্য ২০০ মিলিলিটার তরল দেখে তাচ্ছিল্য করার উপায় নেই। কারণ, এই এক কাপ কফি মানুষের হাতে পৌঁছানোর আগে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অদৃশ্যভাবে খরচ হয়ে যায় প্রায় ১৪০ লিটার পানি। আন্তর্জাতিক জল গবেষণা এবং ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের দীর্ঘদিনের এই পরিসংখ্যান আধুনিক বৈশ্বিক ভোগবাদী সমাজের এক অদ্ভুত বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। যেখানে এক কাপ চা তৈরিতে ৩০ লিটার, কমলালেবুতে ৫০ লিটার কিংবা এক টুকরো রুটিতে ৪০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়, সেখানে কফি তালিকার বেশ ওপরের দিকে অবস্থান করছে।
এই বিশাল পরিমাণ পানির সিংহভাগই সরাসরি কাপে ঢালা হয় না, বরং এর বড় অংশটি ব্যয় হয় সুদূর ইথিওপিয়া, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম কিংবা কলম্বিয়ার পাহাড়ি ঢালে কফিগাছ বেড়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে ‘সবুজ পানি’ বা প্রকৃতির স্বাভাবিক জলচক্রের বৃষ্টি ও মাটির আর্দ্রতা বলা হয়ে থাকে। একটি কফি চেরি পুরোপুরি পাকতে দীর্ঘ মাস সময় নেয়, যে পুরো সময়জুড়ে গাছটি শিকড়ের মাধ্যমে মাটি এবং বাতাস থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প শোষণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কফির মোট জলছাপ বা ওয়াটার ফুটপ্রিন্টের প্রায় ৯৯ শতাংশই আসে এই কৃষি উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে। প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ব্রুয়িংয়ের মতো পরবর্তী ধাপগুলোতে পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নগণ্য।
তবে এই হিসাব নিয়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে তাত্ত্বিক বিতর্কও রয়েছে। অনেক পরিবেশবিদের মতে, প্রকৃতির স্বাভাবিক বৃষ্টির পানিকে কৃত্রিম সেচের পানির সঙ্গে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তা সত্ত্বেও, এই পরিসংখ্যানের সামাজিক ও মানবিক মূল্য অত্যন্ত গভীর। আফ্রিকার ইথিওপিয়ার মতো খরাপ্রবণ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে যেখানে সুপেয় পানির একমাত্র উৎস একটি ভাঙা কুয়া বা বহু দূরের নদী, সেখানে ১৪০ লিটার পানির হিসাব কেবল কোনো গাণিতিক পরিসংখ্যান নয়, বরং তা স্থানীয় মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। সুইজারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশের নাগরিকরা প্রতিদিন প্রচুর কফি পান করলেও, এর ৮০ শতাংশ জলছাপের পরিবেশগত মূল্য চকাতে হয় উন্নয়নশীল দেশের উৎপাদনকারী কৃষকদের।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহুরে তরুণ প্রজন্মের মাঝে কফি সংস্কৃতি ও কফিশপের জনপ্রিয়তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানী ঢাকার অলিতে-গলিতে লাতে, এসপ্রেসো কিংবা কোল্ড ব্রুর কাপ হাতে নেওয়ার অভ্যাসে নাগরিক আধুনিকতা প্রকাশ পেলেও, এর সুদূর পরিবেশগত প্রভাব ও জলবিন্যাসের চিত্রটি থেকে যাচ্ছে আড়ালে। একটি সাধারণ পানীয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বৈশ্বিক পানির সংকট ভবিষ্যতে টেকসই কৃষি ও ভারসাম্যপূর্ণ ভোগ সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলছে।
রিপোর্টার নাম: 





















