বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ লাখ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। কেবল ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে ১০ লাখ কোটি ডলার। এই বিশাল ঋণের অংকের বিপরীতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
সরকারি ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ)। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের ঋণের অংক ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার হলেও, দেশটির জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ১৯৯ শতাংশ, যা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ষষ্ঠ অবস্থানে ইতালির ঋণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে সপ্তম অবস্থানে জার্মানির ঋণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ। ভারতের সরকারি ঋণ ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৮৩ শতাংশ।
তালিকায় চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। যুক্তরাজ্যের ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার (জিডিপির ১০২ শতাংশ) এবং ফ্রান্সের ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার (জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ)। এরপরেই রয়েছে ইতালি, জার্মানি, ভারত, কানাডা ও ব্রাজিল। তালিকার ৪৫তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ।
ঋণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
উন্নত দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। এই অংকটি বিশ্বের সামরিক খাতের মোট ব্যয় (৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ (২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার) কিংবা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ব্যয়ের (২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার) চেয়েও বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বড় অংকের অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবসর ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নবম অবস্থানে কানাডার ঋণ ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার এবং দশতম অবস্থানে ব্রাজিলের ঋণ ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার। সুদের পেছনে ব্যয় ৩৩ লাখ কোটি ডলারের বেশি বিশ্বে ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে।
ইউরোপের অর্থনীতিতে এই ঋণের চাপ বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের মতো দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্সে পরিস্থিতি বেশ নাজুক; গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি ঋণের বিপরীতে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এই পার্থক্য বিনিয়োগকারীদের ফ্রান্সের প্রতি অনাগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। কিছু জায়গায় সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১২ সালে ইউরোপীয় ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সে সময় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল। ফ্রান্সের বর্তমান সুদের হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দেশটির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফেরানোর প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলবে। ঋণের এই চক্র বজায় থাকলে সরকারকে কর বৃদ্ধি কিংবা সরকারি ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
সাধারণত সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য ঋণপত্র ছাড়ে, যা কিনে বিনিয়োগকারীরা সুদ পান। কিন্তু ঋণপত্রের দাম কমে গেলে সুদের হার বেড়ে যায়। এতে নতুন করে ঋণ নেওয়া সরকারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব কেবল সরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাড়ি বা গাড়ির ঋণের মতো ব্যক্তিগত ধার নেওয়ার খরচও এতে বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি এখন সরকারি সেবার মান বজায় রাখা এবং সুদ পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে ভারতের অবস্থান ৮তম। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরকার মূল অর্থ ফেরত দেয়।
রিপোর্টার নাম: 






















