সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি এখন তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা এবং তাদের তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চলার পরও কেন ঢাকা এ বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিল না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। গত ১৪ই অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। এই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে বন্দিদের যে তালিকা পাঠিয়েছিল, সেখানে নাম থাকার পরও কেন তাদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হলো না? বন্দিদের তালিকা পেয়েও কেন তৎপর হয়নি মিশন: কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১লা আগস্ট নজরুল ইসলাম এবং পরদিন সুইটি আক্তারকে আটক করা হয়। এখানেই বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও অসঙ্গতি: বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৩০শে সেপ্টেম্বর জেদ্দায় বাংলাদেশের কন্স্যুলেটে সৌদি কর্তৃপক্ষ বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেখানে নজরুল ও সুইটির নাম এবং যথাক্রমে সাইবার অপরাধ ও ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখ ছিল। তবে তালিকায় তাদের সাজার বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্বীকার করেছেন যে, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি ছিল। তিনি জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ঘটনার পর ১৫ই অক্টোবর জেদ্দাস্থ কন্স্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠায় এবং ১৮ই অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার কাছেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। তবে জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে মৃত্যুদণ্ডের কারণ নিয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
কন্স্যুলেটের ১৮ই অক্টোবরের একটি গোপনীয় স্মারকলিপি অনুযায়ী, দণ্ডিত দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার জন্য কন্স্যুলেটে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। এই স্মারকলিপিতে আরও দাবি করা হয়, সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে দূতাবাস বা কন্স্যুলেটকে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি। এছাড়া সৌদি আদালতে দোভাষীর ব্যবস্থা থাকলেও আসামিরা নিজেদের পছন্দমতো কাউকে বেছে নেয়ার সুযোগ পান না। নজরুল ইসলামের পরিবার জানায়, তারা গণমাধ্যম থেকে এই দুঃসংবাদ পেয়েছে। অথচ ছেলের গ্রেপ্তারের পর থেকে সপ্তাহে একবার তার সঙ্গে যোগাযোগ হতো। এ থেকে প্রশ্ন উঠছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় নিয়মিত যোগাযোগ সত্ত্বেও মিশন কীভাবে পুরো প্রক্রিয়াটির বিষয়ে অন্ধকারে থাকলো? বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলে আইনি সহায়তা, দোভাষীর ব্যবস্থা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
সৌদি আরবের বিচারপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একটি সূত্রের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনকে লিখিতভাবে জানানোর অলিখিত নিয়ম রয়েছে। নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘ সময়জুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যদি বিচারের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশি দোভাষীরা যুক্ত থাকেন, তবে মিশন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে কেন অবহিত ছিল না? সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, নিম্ন আদালতের সাজার পর আপিল আদালতের ১৩ বিচারকের প্যানেল মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিলেন এবং রায় অনুযায়ীই তা কার্যকর করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের বন্দি হস্তান্তর চুক্তির অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। এর আগে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি সম্পন্ন হলেও সৌদি আরবের সাথে তা এখনো ঝুলে আছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলানের সাথে বৈঠকের পর দুই দেশের বিচার বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাবিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল। চুক্তির খসড়া সৌদি আরবে পাঠানোর কথাও উঠেছিল, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখন কোন পর্যায়ে আছে তা অস্পষ্ট। দুই বাংলাদেশির এই অকাল মৃত্যুতে সেই পুরনো আলোচনাটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই বাংলাদেশের: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি করেনি বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে ২০১০ সালে এবং আমিরাতের সঙ্গে ২০১৪ সালে এ চুক্তি হয়।
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর অভিযোগে আটক হলে শুধু বন্দি তালিকায় নাম থাকাই যথেষ্ট নয়। মামলার আইনি অবস্থা, দণ্ডের ধরন এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে নিয়মিত তদারকি করা কন্স্যুলার কর্তব্যের অংশ। নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের দাবি রাখে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মিশন এখন পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের আগে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে পারেনি। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে এখন মামলার বিস্তারিত বিবরণ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল কি না, তা জানতে নতুন করে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে।
রিপোর্টার নাম: 























