বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রবর্তিত সর্বজনীন ও একীভূত ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি ‘বাংলা কিউআর’ এখন নানা প্রশ্নের মুখে। গত জুলাই মাস থেকে এই পদ্ধতিতে লেনদেনের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক খাতে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। জুলাই মাসে এই ব্যবস্থায় দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকায়। এই উল্লম্ফন প্রকৃত কেনাকাটার প্রতিফলন নয় বরং ভুয়া বা সন্দেহজনক লেনদেনের ফসল বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১ জুলাই সব ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরকে বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়। এর ব্যবহার উৎসাহিত করতে গত ১০ আগস্ট আন্তব্যাংক লেনদেনে মাশুল মওকুফসহ নানা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। তবে এরপর থেকেই অস্বাভাবিক লেনদেনের চিত্র বাড়তে থাকে, যা প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চেয়ে অপব্যবহারের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, কিছু অসাধু মার্চেন্ট ও এমএফএস এজেন্ট পণ্য বা সেবা বিক্রি ছাড়াই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট চালাচালি করছেন। মূলত এমএফএস থেকে সাধারণ উপায়ে টাকা ক্যাশ-আউট করতে হাজারে যে ১২ থেকে ১৮ টাকা মাশুল লাগে, তা ফাঁকি দিতেই এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ এমএফএস প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে যে বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার একটি বড় অংশই ভুয়া পেমেন্ট।
অস্বাভাবিক এই লেনদেনের তালিকায় নেত্রকোনার ফুলচান মিয়া নামের এক ব্যক্তির তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ৫৯ বছর বয়সী এই দিনমজুরের অ্যাকাউন্ট থেকে গত মাসে প্রসাধনী ও মোবাইল মেরামতের দোকানের নামে ৪০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। ফুলচান মিয়ার দাবি, তিনি কোনোদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা হবিগঞ্জে যাননি এবং তার কোনো কিউআর অ্যাকাউন্টও নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফুলচানের নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে দোকানে লেনদেন দেখানো হয়েছে, সেই ‘দুলাল টেলিকম’ বেশ কয়েক মাস ধরেই বন্ধ। দোকানমালিক মো. নাজমুল হক দুলাল বড় ধরনের কোনো লেনদেনের কথা অস্বীকার করলেও, নথিপত্রে সোহাগ মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি আগস্ট মাসে তার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৫ লাখ টাকা পেমেন্ট করেছেন বলে প্রমাণ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে এমএফএস প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ গত ২ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠায়। তাদের তথ্যানুযায়ী, ১ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত তাদের প্ল্যাটফর্মে ৩১৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে গভীর রাতে বা ভোরে অস্বাভাবিক বিপুল পরিমাণ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কিছু মার্চেন্ট এক মিনিটের ব্যবধানেই একাধিকবার লেনদেন করে মোট ১০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে।
নগদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং আইএফআইসি ব্যাংক এই সন্দেহজনক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই দুটি ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ২৫৬ কোটি ২ লাখ টাকার পেমেন্ট প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, যার মধ্যে এই দুই ব্যাংক একাই গ্রহণ করেছে ১৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এখানে গড়ে প্রতিটি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ১৬৫ টাকা, যেখানে অন্য সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৪ হাজার ৮৩২ টাকা।
এ বিষয়ে নগদের প্রশাসক মো. মোতাসেম বিল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলা কিউআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি তদন্ত দল ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র আরও বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নতুন এই উদ্যোগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। তবে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হওয়ায়, অনিয়মকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিবেদনটি তৈরিতে নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঠপর্যায়ে চাহিদার সঠিক হিসাব না থাকায় সারের সংকট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেন এত গরম, যা জানালো আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল-মানদেব, বাড়ছে আমদানি ব্যয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নকভির হাত থেকে ট্রফি না নেওয়ার কারণ জানালেন বিসিসিআই সচিব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ব্যবহার বাড়াতে গত ১০ আগস্ট আন্তব্যাংক লেনদেন মাশুল মওকুফের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নেত্রকোনা প্রতিনিধি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ৫৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ভাঙাচোরা একচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্থানীয়রা জানান, ফুলচান পেশায় দিনমজুর।
রিপোর্টার নাম: 























