Hi

১১:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাচীন যুগে যেভাবে জ্যামিতির সাহায্যে মাপা হয়েছিল পিরামিডের উচ্চতা ও পৃথিবীর পরিধি

জ্যামিতি শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে কঠিন সব উপপাদ্য ও জটিল পরিমাপের চিত্র ভেসে ওঠে। অথচ প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘জিওমেট্রি’ বা বাংলা পরিভাষার গভীরে তাকালে দেখা যায়, এর মূল অর্থ হলো ভূমি বা পৃথিবী পরিমাপ। হাজার বছর আগেকার গণিতবিদ ও দার্শনিকরা শুধু খাতার পাতায় দাগ কাটতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং প্রকৃতির নানা জটিল রহস্য উন্মোচনে জ্যামিতির নিখুঁত সূত্রগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। প্রাচীন মিশরের প্রকাণ্ড পিরামিডের উচ্চতা নির্ধারণ থেকে শুরু করে আলেকজান্রিয়ার পণ্ডিতদের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিধি মাপা—সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল স্রেফ জ্যামিতিক যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জোরে।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে গ্রিক পণ্ডিত ও দার্শনিক থেলিস এক যুগান্তকারী কৌশলে গিজার গ্রেট পিরামিডের উচ্চতা মেপেছিলেন, যখন আধুনিক লেজার রশ্মি, ড্রোন বা স্যাটেলাইটের মতো কোনো প্রযুক্তিই ছিল না। তিনি মরুভূমির বালিতে একটি সাধারণ লাঠি সোজা করে পুঁতে দেন এবং একই সময়ে লাঠি ও পিরামিডের ছায়ার অনুপাত পর্যবেক্ষণ করেন। সূর্যের আলো সমান্তরালভাবে পতিত হওয়ার কারণে ছোট ত্রিভুজ এবং পিরামিডের মাধ্যমে সৃষ্ট বড় ত্রিভুজটি সদৃশ ত্রিভুজের রূপ নেয়। সদৃশ ত্রিভুজের বাহুগুলোর অনুপাত সবসময় সমান থাকার এই প্রাকৃতিক নিয়মটিকে কাজে লাগিয়ে থেলিস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পিরামিডের উচ্চতা বের করেন। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে গ্রিস সরকার তাঁর সম্মানে একটি বিশেষ ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছিল।

এর শতক বছর পর, খ্রিস্টপূর্ব ২৪০ অব্দে আলেকজান্রিয়া লাইব্রেরির প্রধান পণ্ডিত ইরাতোস্থেনিস আরও এক অভাবনীয় কীর্তি গড়েন। কোনো উন্নত প্রযুক্তি বা মানচিত্র ছাড়াই তিনি কেবল একটি লাঠির ছায়া এবং দুটি শহরের মধ্যকার দূরত্বের ব্যবধান হিসাব করে পৃথিবীর পরিধি নির্ধারণ করেন। সাইন (বর্তমান আসোয়ান) শহরে গ্রীষ্মকালীন সংক্রান্তির দিন দুপুরে কোনো বস্তুর ছায়া না পড়ার ঘটনাকে ভিত্তি করে তিনি আলেকজান্রিয়ায় সূর্যের পতন কোণ পরিমাপ করেন। জ্যামিতির একান্তর কোণ ও সমান্তরাল রেখার সূত্র প্রয়োগ করে তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ বক্রাকার। তাঁর নির্ণীত পরিধি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পরিমাপের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়, যা মানব বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

পরবর্তীতে ১৯২৯ সালের ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষার্থীর জ্যামিতি খাতার ব্যবহারিক কাজের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, তাত্ত্বিক সূত্র আর বাস্তব পরিমাপের মধ্যে সবসময় কিছু না কিছু ত্রুটি বা অমিল থাকতে পারে। তবে গণিতের মৌলিক নিয়ম এবং জ্যামিতিক যুক্তির ওপর নির্ভর করেই মানবজাতি মহাবিশ্বের বহু অজানা রহস্য ভেদ করেছে। নদীর ওপারের দূরত্ব নির্ণয় থেকে শুরু করে মহাশূন্যের গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে প্রাচীন এই গণিতের চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ ও প্রযুক্তির ছড়াছড়ি থাকলেও প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতদের উদ্ভাবিত এই জ্যামিতিক পদ্ধতিগুলো গণিতচর্চাকে আজও রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় করে রেখেছে।

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাসসংকট: রান্নার অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে পুরো দিন, চরম দুর্ভোগে নগরবাসী

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

প্রাচীন যুগে যেভাবে জ্যামিতির সাহায্যে মাপা হয়েছিল পিরামিডের উচ্চতা ও পৃথিবীর পরিধি

আপডেট : ০৭:২৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

জ্যামিতি শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে কঠিন সব উপপাদ্য ও জটিল পরিমাপের চিত্র ভেসে ওঠে। অথচ প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘জিওমেট্রি’ বা বাংলা পরিভাষার গভীরে তাকালে দেখা যায়, এর মূল অর্থ হলো ভূমি বা পৃথিবী পরিমাপ। হাজার বছর আগেকার গণিতবিদ ও দার্শনিকরা শুধু খাতার পাতায় দাগ কাটতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং প্রকৃতির নানা জটিল রহস্য উন্মোচনে জ্যামিতির নিখুঁত সূত্রগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। প্রাচীন মিশরের প্রকাণ্ড পিরামিডের উচ্চতা নির্ধারণ থেকে শুরু করে আলেকজান্রিয়ার পণ্ডিতদের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিধি মাপা—সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল স্রেফ জ্যামিতিক যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জোরে।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে গ্রিক পণ্ডিত ও দার্শনিক থেলিস এক যুগান্তকারী কৌশলে গিজার গ্রেট পিরামিডের উচ্চতা মেপেছিলেন, যখন আধুনিক লেজার রশ্মি, ড্রোন বা স্যাটেলাইটের মতো কোনো প্রযুক্তিই ছিল না। তিনি মরুভূমির বালিতে একটি সাধারণ লাঠি সোজা করে পুঁতে দেন এবং একই সময়ে লাঠি ও পিরামিডের ছায়ার অনুপাত পর্যবেক্ষণ করেন। সূর্যের আলো সমান্তরালভাবে পতিত হওয়ার কারণে ছোট ত্রিভুজ এবং পিরামিডের মাধ্যমে সৃষ্ট বড় ত্রিভুজটি সদৃশ ত্রিভুজের রূপ নেয়। সদৃশ ত্রিভুজের বাহুগুলোর অনুপাত সবসময় সমান থাকার এই প্রাকৃতিক নিয়মটিকে কাজে লাগিয়ে থেলিস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পিরামিডের উচ্চতা বের করেন। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে গ্রিস সরকার তাঁর সম্মানে একটি বিশেষ ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছিল।

এর শতক বছর পর, খ্রিস্টপূর্ব ২৪০ অব্দে আলেকজান্রিয়া লাইব্রেরির প্রধান পণ্ডিত ইরাতোস্থেনিস আরও এক অভাবনীয় কীর্তি গড়েন। কোনো উন্নত প্রযুক্তি বা মানচিত্র ছাড়াই তিনি কেবল একটি লাঠির ছায়া এবং দুটি শহরের মধ্যকার দূরত্বের ব্যবধান হিসাব করে পৃথিবীর পরিধি নির্ধারণ করেন। সাইন (বর্তমান আসোয়ান) শহরে গ্রীষ্মকালীন সংক্রান্তির দিন দুপুরে কোনো বস্তুর ছায়া না পড়ার ঘটনাকে ভিত্তি করে তিনি আলেকজান্রিয়ায় সূর্যের পতন কোণ পরিমাপ করেন। জ্যামিতির একান্তর কোণ ও সমান্তরাল রেখার সূত্র প্রয়োগ করে তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ বক্রাকার। তাঁর নির্ণীত পরিধি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পরিমাপের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়, যা মানব বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

পরবর্তীতে ১৯২৯ সালের ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষার্থীর জ্যামিতি খাতার ব্যবহারিক কাজের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, তাত্ত্বিক সূত্র আর বাস্তব পরিমাপের মধ্যে সবসময় কিছু না কিছু ত্রুটি বা অমিল থাকতে পারে। তবে গণিতের মৌলিক নিয়ম এবং জ্যামিতিক যুক্তির ওপর নির্ভর করেই মানবজাতি মহাবিশ্বের বহু অজানা রহস্য ভেদ করেছে। নদীর ওপারের দূরত্ব নির্ণয় থেকে শুরু করে মহাশূন্যের গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে প্রাচীন এই গণিতের চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ ও প্রযুক্তির ছড়াছড়ি থাকলেও প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতদের উদ্ভাবিত এই জ্যামিতিক পদ্ধতিগুলো গণিতচর্চাকে আজও রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় করে রেখেছে।