Hi

০১:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামালপুরে সরকারি বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম: অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ

জামালপুর জেলার সাতটি উপজেলায় সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত ৫৩৮টি স্থানীয় উন্নয়নকাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্পে বড় ধরনের হরিলুট হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪২টি প্রকল্পের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩৮টি প্রকল্পে সামান্য কিছু কাজ বা আংশিক বাস্তবায়ন করে পুরো বাজেট লোপাট করা হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জামালপুর জেলার সদর, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী—এই সাত উপজেলায় এডিপির মাধ্যমে মোট ২২ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের বিপরীতে মোট ৫৩৮টি ছোট ও মাঝারি আকারের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রকল্প উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং বাকিগুলো স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তদারকিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পিআইসির মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতেই দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

বকশীগঞ্জ উপজেলায় ‘শিশু যত্ন বিদ্যালয়’ নামের একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আসবাব ও খেলনাসামগ্রী ক্রয়ের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অথচ বাস্তবে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। স্থানীয় শিক্ষা অফিস থেকেও বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। একইভাবে মেলান্দহ উপজেলার চরবাণিপাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে কম্পিউটার সরবরাহ এবং রুম মেরামতের বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পিআইসি সভাপতি ও ওয়ার্ড সদস্য পর্যন্ত জানেন না যে তাদের নামে কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল।

মাদারগঞ্জ উপজেলায় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কম্পিউটার ও আসবাবপত্র কেনার নামে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর কোনো হদিস মেলেনি। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তার কার্যালয় এ ধরনের কোনো বরাদ্দের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন সংস্কার, রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সিংহভাগ কাজই কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। কোথাও আংশিক কাজ করে কিংবা অন্য কোনো পুরোনো প্রকল্পের কাজকে নতুন নামে চালিয়ে দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তদারকির অভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণেই সরকারি এই তহবিল নয়ছয় হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দাবি করেছে যে তারা কেবল কারিগরি সহায়তা দিয়েছে, আর প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ছাড়ের মূল দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমগ্র ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ।

জনপ্রিয়

১৪ লাখ বছর আগেই মানবসমাজে ছিল লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ভূমিকা, নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

জামালপুরে সরকারি বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম: অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ

আপডেট : ১১:২২:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

জামালপুর জেলার সাতটি উপজেলায় সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত ৫৩৮টি স্থানীয় উন্নয়নকাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্পে বড় ধরনের হরিলুট হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪২টি প্রকল্পের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩৮টি প্রকল্পে সামান্য কিছু কাজ বা আংশিক বাস্তবায়ন করে পুরো বাজেট লোপাট করা হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জামালপুর জেলার সদর, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী—এই সাত উপজেলায় এডিপির মাধ্যমে মোট ২২ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের বিপরীতে মোট ৫৩৮টি ছোট ও মাঝারি আকারের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রকল্প উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং বাকিগুলো স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তদারকিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পিআইসির মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতেই দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

বকশীগঞ্জ উপজেলায় ‘শিশু যত্ন বিদ্যালয়’ নামের একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আসবাব ও খেলনাসামগ্রী ক্রয়ের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অথচ বাস্তবে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। স্থানীয় শিক্ষা অফিস থেকেও বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। একইভাবে মেলান্দহ উপজেলার চরবাণিপাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে কম্পিউটার সরবরাহ এবং রুম মেরামতের বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পিআইসি সভাপতি ও ওয়ার্ড সদস্য পর্যন্ত জানেন না যে তাদের নামে কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল।

মাদারগঞ্জ উপজেলায় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কম্পিউটার ও আসবাবপত্র কেনার নামে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর কোনো হদিস মেলেনি। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তার কার্যালয় এ ধরনের কোনো বরাদ্দের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন সংস্কার, রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সিংহভাগ কাজই কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। কোথাও আংশিক কাজ করে কিংবা অন্য কোনো পুরোনো প্রকল্পের কাজকে নতুন নামে চালিয়ে দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তদারকির অভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণেই সরকারি এই তহবিল নয়ছয় হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দাবি করেছে যে তারা কেবল কারিগরি সহায়তা দিয়েছে, আর প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ছাড়ের মূল দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমগ্র ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ।