Hi

০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: ফেড গভর্নর লিসা কুকের পদ সুরক্ষিত, তবে রাষ্ট্রপতির বরখাস্তের ক্ষমতা প্রসারিত

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক মিশ্র রায়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং স্বাধীন সরকারি সংস্থাগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এই রায়ে ফেডারেল রিজার্ভের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য লিসা কুক আপাতত তার পদে বহাল থাকতে পারবেন বলে জানানো হলেও, স্বাধীন সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক নজিরকে উল্টে দিয়েছে এবং নির্বাহী শাখার ওপর রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মত দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীন সংস্থাগুলোর একক প্রধানদের কারণ দর্শানো (for cause) ছাড়াই বরখাস্ত করতে পারবেন। এটি ঐতিহ্যগতভাবে স্বাধীন সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তবে, ফেডারেল রিজার্ভের মতো বহু-সদস্যের বোর্ড বা কমিশনের ক্ষেত্রে, যেখানে সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কাজ করেন এবং তাদের অপসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট কারণ প্রয়োজন হয়, সেখানে এই ক্ষমতা কিছুটা সীমিত থাকবে। এই পার্থক্যটিই ফেড গভর্নর লিসা কুকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে, যার ফলে তার পদ আপাতত সুরক্ষিত রয়েছে। আদালত তার ক্ষেত্রে অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত কারণ খুঁজে পায়নি, অথবা ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের কাঠামোর কারণে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিকভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC)-এর মতো স্বাধীন সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখতে তাদের প্রধানদের অপসারণের জন্য ‘কারণ’ (for cause) প্রয়োজন ছিল। ১৯৩৫ সালের ‘হামফ্রেস এক্সিকিউটর বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’ মামলার মতো পূর্ববর্তী রায়গুলো স্বাধীন সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন রায় সেই নজিরকে আংশিকভাবে হলেও বাতিল করে দিয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতাকে অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়েছে।

এই রায়ের প্রেক্ষাপটে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা প্রাসঙ্গিক। ট্রাম্প তার শাসনামলে বেশ কয়েকটি স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের অপসারণ করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের কাজে নির্বাহী শাখার অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত, যদিও সরাসরি ট্রাম্পের বর্তমান ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে না, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্রপতির জন্য স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করবে। এটি ট্রাম্পের এমন একটি আইনি বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে যা তার ক্ষমতা প্রয়োগের দর্শনকে সমর্থন করে।

এই রায়কে ঘিরে আইন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে এটিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা নির্বাহী শাখার কার্যকারিতা বাড়াবে। তবে, সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে, এটি স্বাধীন সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, যা দেশের মুদ্রানীতি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াবে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো গণমাধ্যমে এই রায়কে ‘আদালতের ভণ্ডামি’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা রায়ের সাংবিধানিক ভিত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই রায় মার্কিন শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতিদের স্বাধীন সংস্থাগুলোর নীতি ও কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা দেবে, যা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে পারে। একদিকে যেমন এটি রাষ্ট্রপতির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে, তেমনি অন্যদিকে এটি সরকারে স্থিতিশীলতা ও বিশেষজ্ঞ শাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

পেজেশকিয়ানের স্পষ্ট শর্ত: পারমাণবিক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা চায় ইরান

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ খন্দকার আইটি

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: ফেড গভর্নর লিসা কুকের পদ সুরক্ষিত, তবে রাষ্ট্রপতির বরখাস্তের ক্ষমতা প্রসারিত

আপডেট : ০১:৩৮:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক মিশ্র রায়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং স্বাধীন সরকারি সংস্থাগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এই রায়ে ফেডারেল রিজার্ভের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য লিসা কুক আপাতত তার পদে বহাল থাকতে পারবেন বলে জানানো হলেও, স্বাধীন সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক নজিরকে উল্টে দিয়েছে এবং নির্বাহী শাখার ওপর রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মত দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীন সংস্থাগুলোর একক প্রধানদের কারণ দর্শানো (for cause) ছাড়াই বরখাস্ত করতে পারবেন। এটি ঐতিহ্যগতভাবে স্বাধীন সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তবে, ফেডারেল রিজার্ভের মতো বহু-সদস্যের বোর্ড বা কমিশনের ক্ষেত্রে, যেখানে সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কাজ করেন এবং তাদের অপসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট কারণ প্রয়োজন হয়, সেখানে এই ক্ষমতা কিছুটা সীমিত থাকবে। এই পার্থক্যটিই ফেড গভর্নর লিসা কুকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে, যার ফলে তার পদ আপাতত সুরক্ষিত রয়েছে। আদালত তার ক্ষেত্রে অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত কারণ খুঁজে পায়নি, অথবা ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের কাঠামোর কারণে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিকভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC)-এর মতো স্বাধীন সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখতে তাদের প্রধানদের অপসারণের জন্য ‘কারণ’ (for cause) প্রয়োজন ছিল। ১৯৩৫ সালের ‘হামফ্রেস এক্সিকিউটর বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’ মামলার মতো পূর্ববর্তী রায়গুলো স্বাধীন সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন রায় সেই নজিরকে আংশিকভাবে হলেও বাতিল করে দিয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতাকে অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়েছে।

এই রায়ের প্রেক্ষাপটে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা প্রাসঙ্গিক। ট্রাম্প তার শাসনামলে বেশ কয়েকটি স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের অপসারণ করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের কাজে নির্বাহী শাখার অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত, যদিও সরাসরি ট্রাম্পের বর্তমান ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে না, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্রপতির জন্য স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করবে। এটি ট্রাম্পের এমন একটি আইনি বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে যা তার ক্ষমতা প্রয়োগের দর্শনকে সমর্থন করে।

এই রায়কে ঘিরে আইন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে এটিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা নির্বাহী শাখার কার্যকারিতা বাড়াবে। তবে, সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে, এটি স্বাধীন সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, যা দেশের মুদ্রানীতি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াবে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো গণমাধ্যমে এই রায়কে ‘আদালতের ভণ্ডামি’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা রায়ের সাংবিধানিক ভিত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই রায় মার্কিন শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতিদের স্বাধীন সংস্থাগুলোর নীতি ও কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা দেবে, যা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে পারে। একদিকে যেমন এটি রাষ্ট্রপতির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে, তেমনি অন্যদিকে এটি সরকারে স্থিতিশীলতা ও বিশেষজ্ঞ শাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।